জ্বালানি নিরাপত্তায় বহুমুখীকরণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার তাগিদ

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, জ্বালানির অপচয় কমানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা।

তারা বলেছেন, জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। অর্থনীতি, শিল্প, পরিবেশ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

সোমবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের কাউন্সিল হলে ‘এনার্জি সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ: আন্ডারস্ট্যান্ডিং দি চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড সেপিং দি ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আইইবির ইয়াং ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টার এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও জনজীবনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়া, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা জ্বালানি নিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দেন অধ্যাপক সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া। তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎসহ অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

শিল্প, পরিবহন ও ভবন খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে স্মার্ট গ্রিড, এনার্জি স্টোরেজ, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দক্ষ প্রকৌশল নেতৃত্বের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বাংলাদেশ নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আইইবি সদর দপ্তরের উদ্যোগে ইতিমধ্যে চারটি সেমিনার হয়েছে। এসব সেমিনারে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে পাওয়া সুপারিশগুলো একত্র করে একটি সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ জ্বালানির অপচয় ও অদক্ষ ব্যবহার। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিকল্পনাহীন ব্যয়ের কারণে সীমিত জ্বালানি সম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে।

বর্তমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে সরকারি অর্থে কিছু কর্মকর্তার অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফরের সমালোচনা করেন খান মনজুর মোরশেদ। একই সঙ্গে কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা না থাকা অকারিগরি জনবল দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি পদ পরিচালনার বিষয়েও উদ্বেগ জানান তিনি।

তিনি বলেন, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে যোগ্য, অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রকৌশলীদের যথাযথ দায়িত্ব দেওয়া জরুরি।

অতীতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহ, ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি প্রাপ্যতা নিয়ে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা পর্যালোচনার আহ্বান জানান তিনি।

খান মনজুর মোরশেদ বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদনক্ষমতা বিবেচনা করলে হবে না। জ্বালানি সরবরাহ, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, পরিচালন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

যেসব প্রকল্প যথাযথ পরিকল্পনা, কারিগরি মূল্যায়ন ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর আর্থিক ও পরিচালনগত চাপ সৃষ্টি করছে, সেসব প্রকল্পের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল। তিনি বলেন, দেশের প্রকৌশলীদের পেশাগত উন্নয়ন ও জাতীয় উন্নয়নে আইইবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

তিনি জানান, বর্তমানে আইইবি ১৮টি কেন্দ্র, ৩৫টি উপকেন্দ্র, ১৪টি ওভারসিজ চ্যাপ্টার, ৭টি প্রকৌশল বিভাগ, ২টি প্রকৌশল চ্যাপ্টার ও ৫টি বোর্ডের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা বিষয়ে সেমিনার থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে, যাতে জাতীয় পর্যায়ে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তা কাজে লাগানো যায়।

সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইইবির ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন তালুকদার, বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আমান উদ্দিন এবং ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের হেড অব করপোরেট প্ল্যানিং অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট মো. সাজিদুল ইসলাম।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির ইয়াং ইঞ্জিনিয়ার্স চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জেল হোসেন। সঞ্চালনা করেন চ্যাপ্টারের সম্পাদক প্রকৌশলী শফিউল আজম (ফাহিম)। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন চ্যাপ্টারের ভাইস-চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন।

অনুষ্ঠানে আইইবির সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ ওসমানী, সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এইচআরডি) প্রকৌশলী মো. নূর আমিনসহ আইইবির বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের নেতা, প্রকৌশল চ্যাপ্টারের নেতৃবৃন্দ, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য এবং বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থার প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।