দেশের শিল্প ও অবকাঠামো খাত যেভাবে বড় হচ্ছে, ঠিক একইভাবে বাড়ছে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। দেশে এই সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সচেতনতার অভাব ও দক্ষতার সংকট। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘স্ট্রেনদেনিং অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড ওয়ার্কফোর্স এক্সেলেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আইইবি’র অকুপেশনাল সেফটি বোর্ড অব বাংলাদেশ (ওএসবিবি)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আইইবি’র প্রেসিডেন্ট ও রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম (রিজু)। সড়ক নিরাপত্তা ও ভবনের সুরক্ষায় গাফিলতির বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শুধু আইন করলেই হবে না, তার বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকার, পেশাজীবী সংগঠন ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, দেশে নিরাপত্তা–সংক্রান্ত অনেক আইন ও নীতিমালা থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ খুব কম দেখা যায়। এখনো অনেক মোটরসাইকেল চালক হেলমেট ব্যবহার করেন না, আবার চালক হেলমেট পরলেও যাত্রীরা অনেক সময় তা ব্যবহার করেন না। অনেক গাড়িচালকও সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালান, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। বহু ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার জন্য ফায়ার এক্সিট থাকলেও সেখানে মালামাল রেখে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ ব্যাহত হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইইবি’র সম্মানীয় সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান। দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশেষ করে শিপবিল্ডিং শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। অনেক শ্রমিক পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন, ফলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা থেকেই যায়।
দেশে একটি সামগ্রিক নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, দেশে নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার, ঝুঁকি মোকাবিলা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর হতে পারে বলে মত দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওএসবিবি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া। তৈরি পোশাক, নির্মাণ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতের শ্রমিকদের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তবে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং দক্ষতার ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, মহড়া ও সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর আহ্বান জানান তিনি। হেলমেট, গ্লাভস, মাস্ক ও সেফটি ড্রেস ব্যবহারে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।
দক্ষতার অভাবকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া আরও বলেন, দক্ষতার অভাব কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তাই প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পখাতভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম বাড়াতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল দক্ষতায় শ্রমশক্তিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ওপর জোর দেন তিনি।
ওএসবিবি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী সৈয়দা সুলতানা রাজিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন আইইবি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসঅ্যান্ডডব্লিউ) প্রকৌশলী নিয়াজ উদ্দিন ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানে আইইবির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা কেন্দ্রের নেতৃবৃন্দ, কাউন্সিল সদস্য এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন।