দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা ও ভাষা কোর্সে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়েমেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং বিভিন্ন ভাষা কোর্সে ভর্তির জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হচ্ছে।
তবে এই সুযোগে আবেদন করার সময় খুবই সীমিত। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত অনলাইন ফর্ম পূরণের শেষ সময় আজ, ১০ এপ্রিল ২০২৬। শেষ দিনের কারণে এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেদন নিয়ে বাড়তি আগ্রহ দেখা গেছে।
কোন কোন কোর্সে সুযোগ মিলবে
বোয়েসেলের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক ভিসা ক্যাটাগরিতে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। এগুলো হলো ডি৪-১: কোরিয়ান ভাষা কোর্স, ডি৪-৭: ইংরেজি ভাষা কোর্স, ডি২-১: অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রি (ডিপ্লোমা সমমান), ডি২-২: স্নাতক (অনার্স) এবং ডি২-৩: স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স)। এই প্রতিটি ক্যাটাগরির জন্য আলাদা যোগ্যতা ও শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের অবশ্যই পূরণ করতে হবে।
ভাষা কোর্সে আবেদনের শর্ত
যারা প্রথমে ভাষা কোর্সে পড়াশোনা করতে চান, তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ শর্ত রাখা হয়েছে। শর্তগুলো হলো এসএসসি এবং এইচএসসি বা ডিপ্লোমায় ন্যূনতম ৭০ শতাংশ নম্বর। আর পাসের সাল ২০২৩, ২০২৪ বা ২০২৫ হতে হবে। ভালো খবর হলো আইইএলটিএস বা টপিক বাধ্যতামূলক নয়।
তবে যাদের ইংরেজি বা কোরিয়ান ভাষার সার্টিফিকেট রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। ভাষা কোর্স শেষ করে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া যাবে।
অ্যাসোসিয়েট ও অনার্স প্রোগ্রাম
অ্যাসোসিয়েট (ডিপ্লোমা সমমান) এবং অনার্স ডিগ্রিতে পড়তে চাইলে কিছুটা কঠোর শর্ত পূরণ করতে হবে। যোগ্যতা অনুযায়ী এসএসসি ও এইচএসসি বা ডিপ্লোমায় ন্যূনতম ৭০ শতাংশ নম্বর। আইইএলটিএস ৫.৫ অথবা টপিক লেভেল ৩। অ্যাসোসিয়েট প্রোগ্রামে টপিক লেভেল ২ গ্রহণযোগ্য। আর পাসের সাল হতে হবে ২০২৩ থেকে ২০২৫।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ইংরেজি দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানানো হয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি ভাষার স্কোরের ওপর ভিত্তি করে ভর্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যায়।
মাস্টার্স প্রোগ্রামে সুযোগ
স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য তুলনামূলক বেশি প্রস্তুতি প্রয়োজন। মাস্টার্সের জন্য শর্তে রয়েছে অনার্সে ন্যূনতম ৭০ শতাংশ নম্বর লাগবে। আইইএলটিএস ৫.৫ বা টপিক লেভেল ৩। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যাচ (২০২০–২০২২) পর্যন্ত বিবেচনা করা হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভর করে স্কলারশিপ ও ফান্ডিংয়ের সুযোগও পাওয়া যেতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠানভেদে আলাদা।
আর্থিক সক্ষমতা বা ব্যাংক সলভেন্সি
শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই হবে না, আর্থিক সক্ষমতাও প্রমাণ করতে হবে। এই শর্তকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে ধরা হচ্ছে। বোয়েসেলের নির্দেশনা অনুযায়ী, অ্যাসোসিয়েট ও অনার্সের জন্য অন্তত ১২ হাজার ডলার সমপরিমাণ ব্যাংকে টাকা থাকতে হবে। আর মাস্টার্সের জন্য অন্তত ১৬ হাজার ডলার। আর অন্তত ৬ মাসের ব্যাংক লেনদেনের দেখাতে হবে।
স্পনসর হিসেবে কেবল নিজের আয়, বাবা-মা অথবা স্বামী/স্ত্রীকে গ্রহণ করা হবে। অন্য কোনো আত্মীয় বা ব্যক্তি স্পনসর করতে পারবে না। যদি ব্যাংক লোন নেওয়া হয়, তার সম্পূর্ণ দায়ভার প্রার্থীকেই বহন করতে হবে।
আবেদন প্রক্রিয়া কেমন
আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অনলাইনে নির্দিষ্ট গুগল ফর্মের মাধ্যমে তথ্য জমা দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে কোনো কাগজপত্র আপলোড না হলেও, তথ্য যাচাইয়ের পর নির্বাচিত প্রার্থীদের কাছে পরবর্তী নির্দেশনা পাঠানো হবে।
বোয়েসেল জানায়, যাচাই শেষে ইমেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে অফিসে কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য ডাকা হবে।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদনের পরবর্তী ধাপে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে, সেগুলো হলো বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ থাকতে হবে), পাসপোর্ট সাইজ ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড), জাতীয় পরিচয়পত্র ও পারিবারিক সনদ, শিক্ষাগত সনদ ও মার্কশিট (এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স), ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট, ট্যাক্স রিটার্ন বা আয় প্রমাণ এবং স্পনসরের চাকরি বা ব্যবসার প্রমাণ। আর পরবর্তী ধাপে লাগবে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও মেডিকেল রিপোর্ট। সব ডকুমেন্ট স্ক্যান করে অনলাইনে জমা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
স্কলারশিপের সুযোগ
দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার ভিত্তিতে স্কলারশিপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত টিউশন ফি মওকুফ হতে পারে। আইইএলটিএস বা টপিক স্কোরের ওপর ভিত্তি করে স্কলারশিপ নির্ধারণ করা হয়। প্রথম সেমিস্টারের পর ভালো ফল করলে পরবর্তী সেমিস্টারেও সুবিধা বাড়তে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এই সুযোগ ভিন্ন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়।
সতর্কবার্তা
বোয়েসেল বিশেষভাবে জানিয়েছে, শুধু আবেদন করলেই ভিসা পাওয়া যাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভর্তি, ইন্টারভিউ এবং ভিসা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও কোরিয়ান কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে। তাই আবেদনকারীদের সব তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
কেন এই সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনার সুযোগ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। কারণ বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স, স্কলারশিপের সুযোগ এবং পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সম্ভাবনা। তবে একই সঙ্গে আর্থিক প্রস্তুতি ও ভাষাগত দক্ষতা না থাকলে এই প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
আজই আবেদন শেষ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া দেখা যাচ্ছে। যারা এখনো আবেদন করেননি, তাদের দ্রুত অনলাইনে ফর্ম পূরণ করতে বলা হয়েছে।
সরকারি এই উদ্যোগকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার একটি সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে দেখা হলেও, সঠিক প্রস্তুতি ছাড়া সফল হওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।