প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে ইউনিসেফের ভয়াবহ তথ্য

ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে এক কিশোর। তাকে পঞ্চম শ্রেণির একটি সাধারণ অঙ্ক সমাধান করতে দেওয়া হলো। সে পারল না। বাংলা পড়তে দেওয়া হলো, সেখানেও সে হিমশিম খাচ্ছে। আপনি কি জানেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক পাস করা ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থীরই এ অবস্থা? সম্প্রতি ইউনিসেফ এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র। শিশুরা প্রাথমিকের গণ্ডি পার হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের শেখার মান রয়ে গেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কেন প্রাথমিক শিক্ষার এই করুণ দশা? হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও কেন ফল মিলছে না? 

ইউনিসেফ কী বলছে?
ইউনিসেফের 'ব্রিঙ্গিং লার্নিং টু লাইফ' শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত বেজলাইন অ্যাসেসমেন্টে ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থীই পঞ্চম শ্রেণির গণিতের অর্ধেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। বাংলার কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এর মানে হলো, প্রাথমিকের পাঁচ বছরের পাঠ চুকিয়ে হাইস্কুলে উঠলেও তাদের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন তৈরি হয়নি। তারা কেবল মুখস্থ করেই পরীক্ষায় পাস করছে, কিন্তু শিখছে না কিছুই।

কেন এ সংকট?
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কেন এমনটা হচ্ছে? বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমেদ একটি তথ্য দিয়েছেন। দেশের ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৩২ হাজার স্কুলেই কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। যখন অর্ধেক স্কুলেই স্থায়ী নেতৃত্ব নেই, তখন সেখানে তদারকি (মনিটরিং), শিক্ষকদের জবাবদিহি বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার কেউ থাকে না। এ ছাড়া রয়েছে দক্ষ শিক্ষকের অভাব, মানসম্মত প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা। অনেক শিক্ষক ক্লাসে অনুপস্থিত থাকেন কিংবা পাঠদানের চেয়ে প্রশাসনিক কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।

ক্লাসরুমে সময় কম
আরেকটি বড় কারণ হলো ‘ক্লাস আওয়ার’ বা পাঠদানের সময়। বছরে যেখানে ক্লাস হওয়ার কথা ৫০০ থেকে ৭০০ ঘণ্টা, সেখানে বন্যা, ছুটি আর শিক্ষকদের অবহেলায় তা নেমে আসে মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ ঘণ্টায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের শিক্ষাক্রম এখনো মুখস্থনির্ভর। গণসাহায্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা এফ আর মাহমুদ হাসানের মতে, হাতে-কলমে শেখার কোনো সুযোগ এখানে নেই। শিক্ষার্থীরা নোটবই আর প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা তাদের সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করছে।

বিনিয়োগ বনাম ফলাফল
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কি তাহলে প্রাথমিক শিক্ষায় টাকা খরচ করছে না? উত্তর হলো—করছে এবং তা বিশাল অঙ্কের। শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহসানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এর আগে পিইডিপি-৪ প্রকল্পে ৩২ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। বর্তমানে পিইডিপি-৫ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। তিনি নিজেই অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, এত বিপুল বিনিয়োগের পরও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছে না। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল অর্থের নয়, বরং সঠিক বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির।

সমাধানের পথ কী?
গবেষকরা বলছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
১. গ্রেড অনুযায়ী নয়, বরং শিশুর বর্তমান মেধা যাচাই করে পাঠদান শুরু করতে হবে।
২. পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করতে হবে।
৩. মুখস্থবিদ্যার বদলে কার্যকর মূল্যায়ন বা ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট চালু করতে হবে।
৪. পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষা কেবল নীতি বা খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে শ্রেণিকক্ষে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেবল সনদধারী নয়, বরং দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনই এই শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।