মহাকালের চেনা পথ ধরে এসেছে বাইশে শ্রাবণ। আজ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে কবিগুরুর ঋণ। রবির কিরণে সমৃদ্ধ হয়েছে চলচ্চিত্রও। হিন্দি, বাংলা-নানা ভাষায় নির্মিত হয়েছে তাঁর সাহিত্য নিয়ে চলচ্চিত্র। হয়েছে প্রশংসিত, নন্দিত। দেখে নেওয়া যাক কবির নন্দিত ৬ চলচ্চিত্র।
চোখের বালি
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে যত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ‘চোখের বালি’-কে। স্বনামের উপন্যাসকে ভিত্তি করে চলচ্চিত্র তৈরি করেছেন অনেক নির্মাতা। সর্বপ্রথম এই উপন্যাস নিয়ে সিনেমা বানানো হয় ১৯৩৮ সালে। সতু সেন পরিচালিত সেই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়, ইন্দিরা রায়, শান্তিলতা ঘোষ, রমা বন্দ্যোপাধ্যায়, হরেন মুখোপাধ্যায়, ছবি বিশ্বাস, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রমুখ। এরপর ২০০৩ ‘চোখের বালি’ নির্মাণ করেছেন প্রয়াত নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ। এতে অভিনয় করেন–ঐশ্বরিয়া রাই, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, টোটা রায়চৌধুরী, লিলি চক্রবর্তী প্রমুখ। বিনোদিনী নামের এক বিধবার মানসিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে চলচ্চিত্রের কাহিনি। দুই বিধবার মধ্যকার বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক নিয়ে চলচ্চিত্রের কাহিনি পায় নতুন মাত্রা। ঐশ্বরিয়া এখানে ‘বিনোদিনী’ ও রাইমা সেন ‘আশালতা’ চরিত্রে অভিনয় করেন।
কাবুলিওয়ালা
রবীন্দ্রনাথের লেখা ছোটগল্প অবলম্বনে ১৯৯৭ সালে তপন সিনহা পশ্চিমবঙ্গে তৈরি করেন কাবুলিওয়ালা। আফগান কাবুলিওয়ালা রহমত ও বাঙালি কন্যা মিনির মিষ্টি সম্পর্কের এ গল্প অধরা থাকেনি বলিউডেও। চার বছর পর বিমল রায় হিন্দিতে তৈরি করেছিলেন কাবুলিওয়ালা। বিমল রায়ের ছবিতে কাবুলিওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন বলরাজ সাহানি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম কাল্ট ছবি হিসেবে পরিগণিত এটি। বাংলাদেশও থেমে থাকেনি। ২০০৬ সালে কাজী হায়াত নায়ক মান্না ও দীঘিকে নিয়ে নির্মাণ করেন কাবুলিওয়ালা।
চারুলতা
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘চারুলতা’ এখনও অনন্য। সত্যজিতের ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলস্টোন হিসেবে পরিগণিত এ ছবি বাংলা চলচ্চিত্রে সম্পদ হিসেবে ধরা হয়। এর গল্পটি নেওয়া হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ গল্প থেকে। অবহেলিত এক গৃহবধূর গল্প বলা হয়েছে এতে। যেখানে দেবরের সঙ্গে ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র চারুর এক অব্যক্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। চলচ্চিত্রটি দেশ বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার লাভ করে, এর মধ্যে ১৯৬৪ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে সিলভার বেয়ার পুরস্কার, ১৯৬৫ সালে সেরা চলচ্চিত্র ক্যাটাগরিতে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের গোল্ডেন লোটাস পুরস্কার জয় এবং ১৯৬৫ সালে ওসিআইসি পুরস্কার।
সুভা
২০০৫ সালে চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘সুভা’ ছবিটি মুক্তি পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুভা ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিতে জুটি বেধে অভিনয় করেছেন শাকিব খান ও পূর্ণিমা।
‘সুভা’ চরিত্রে বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ের ভূমিকায় পূর্ণিমার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল সর্বমহলে। শাকিব খানের অভিনয়ও নজর কেড়েছিল সমালোচকদের। ইমন সাহার সংগীত পরিচালনায় বাপ্পা মজুমদারে কণ্ঠে ‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে’ গানটিও ছিল চমৎকার। এ ছাড়া সহ-শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন সুজাতা, তুষার খান, সালেহ আহমেদ।
অবুঝ বউ
রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির পরিচালক নারগিস আখতার। ‘অবুঝ বউ’ মুক্তি পায় ২০১০ সালে। এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ববিতা, ফেরদৌস, শাকিল খান ও নিপুণ। চলচ্চিত্রটি ৩৫ তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। এ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার জেতেন নারগিস আখতার। এ ছাড়া সংগীতায়োজক হিসেবে পুরস্কৃত হন সুজেয় শ্যাম। সেরা সম্পাদনা বিভাগেও পুরস্কৃত হয় ছবিটি।
ঘরে-বাইরে
১৯৮৪ সালে রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত এ চলচ্চিত্রে দুই আবাল্য সুহৃদ সন্দীপ ও নিখিলেশের সম্পর্কের টানাপোড়ন সার্থকভাবে রূপায়িত হয় রুপালি ফিতায়। নিখিলেশের স্ত্রী বিমলার প্রতি সন্দীপের আকর্ষণ, তাদের প্রেম আর ইংরেজবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের অনেক সূক্ষ্ম বিষয় তুলে ধরে উপন্যাসটির এই চিত্ররূপ। বিমলা চরিত্রে ছিলেন স্বাতীলেখা চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপের ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং নিখিলেশ ছিলেন ভিক্টর ব্যানার্জি। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মাননা পায় ‘ঘরে-বাইরে’।