মিমকে সিনেমাটি না করতে চাপ দিয়েছিলেন ডিবি হারুন

ছাত্র-জনতার গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা। গা ঢাকা দিয়েছেন তার দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। একে একে বেরিয়ে আসছে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর সময়কালের নানা ঘটনা ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেশের প্রায় প্রতিটি অঙ্গনেই আওয়ামীপন্থীরা গড়ে তুলেছিল নিজেদের সাম্রাজ্য। শোবিজ অঙ্গনও এ থেকে বাদ যায়নি।

বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মাতা সুমন ধর ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘আমি ইয়াসমিন বলছি’ নামের একটি সিনেমার। গত বছর এতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম। প্রি-প্রোডাকশন শেষ করে টিম যখন শুটিংয়ে যাবে, ঠিক তখনই ছবিটি থেকে সরে দাঁড়াতে চাপ দেওয়া হয় অভিনেত্রীকে। আর সেই ফোনকলটি করেছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) হারুন অর রশীদ। 

বিষয়টি নিয়ে এতদিন চুপ থাকলেও অবশেষে মুখ খুলেছেন নির্মাতা সুমন। গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘‌‘একদিন জায়েদ ভাই আমাকে ফোন করে বলেন, ‘আপনাকে আমার সঙ্গে একটু হারুন ভাইয়ের ওখানে যেতে হবে। কেন যেন আপনাকে ডাকছেন। আমি যেহেতু চলচ্চিত্রের মানুষ, তাই আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।’ পরদিন আমি গেলাম, কয়েক মিনিটের ব্যবধানে জায়েদ ভাইও ঢুকলেন। দেখলাম, হারুন সাহেব তার রুমে বসা। তার টিমও আছে। সালাম দেওয়ার পর আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী অবস্থা? শুনলাম, আপনি একটা সিনেমা করছেন, আমি ইয়াসমিন বলছি?’ বললাম, হ্যাঁ করছি। তিনি বললেন, ‘এটা নিয়ে অনেক কথাবার্তা আছে। এই ছবি আসলে করা যাবে না। আমাদের এখানে বড় বড় আরও শক্তিশালী গল্প আছে। ওগুলো আপনাকে দিই, সেখান থেকে করেন।’’

শুধু তা-ই নয়, সিনেমাটি না করার জন্য একপ্রকার হুমকি দেওয়া হয়েছিল পরিচালককে! তাঁর ভাষ্য, ‘বললাম, এই ছবির পেছনে আমি অনেক পরিশ্রম করেছি। সেই ২০১৭ সাল থেকে লেগে আছি। যেহেতু সত্যি গল্প, সিনেমার মধ্যে যেন সবটুকু সঠিকভাবে উঠে আসে, তার জন্য অনেক গবেষণা করতে হয়েছে। নিজেরও টাকা বিনিয়োগ আছে, প্রযোজকেরও আছে। সবচেয়ে বড় কথা, ছবিটা বানাব বলেই ওই সময় নাটক বানানো কমিয়ে দিই। টুকটাক যে বিজ্ঞাপনচিত্র বানাতাম, তাও বন্ধ করে দিই। ছবিটা না হলে অর্থনৈতিকভাবে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হব। নাছোড়বান্দা হারুন ভাই এটুকু বললেন, ‘এই ছবি করা যাবে না।’ তিনি যে আমার সঙ্গে খুব রাগী গলায় কথা বলেছেন, তা নয়। এরপর তার সহকারীকে ডেকে বললেন, ‘আমাদের কাছে ভালো ভালো গল্প আছে, সেগুলো সুমনের সঙ্গে শেয়ার করেন। সুমন যেটা পছন্দ করবেন, সেটা করবেন। আর সুমনের যদি স্পনসর প্রয়োজন হয়, আমরা জোগাড় করে দেব।’’’

এদিকে, পরিচালকের সঙ্গে যখন ডিবি হারুনের কথা হচ্ছিল, তখন মিম তাঁর ‘মানুষ’ সিনেমার কাজে ব্যস্ত ছিলেন কলকাতায়। এ সময় হারুন নিজেই হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেন মিমকে।

সেদিনের কথা জানিয়ে অভিনেত্রী বলেন, ‘‘কল দেখে একটু ঘাবড়ে যাই। তিনি (হারুন অর রশীদ) কেন আমাকে ফোন করবেন? ভাবতেও পারিনি যে আমার কাছে এমন একটি ফোনকল সেদিন আসবে আর বলা হবে যে ছবিটিতে অভিনয় করতে পারব না। যখন তিনি বললেন, ‘তোমার পরিচালক আমার সামনে বসা।’ তখন বুঝতে বাকি থাকেনি যে ছবিটা বোধ হয় আর হবে না। পরিচালক বের হওয়ার পর ফোন করে তা নিশ্চিত হই। সব মিলিয়ে মনটা খুব খারাপ হয়। শিল্পীর জীবনে চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ সব সময় আসে না। আসার পর যখন আবার তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়, তখন মন খারাপ হয়।’’’

তবে এখন আর মন খারাপলাগা নেই অভিনেত্রীরও। অবশেষে ছবিটির শুটিংয়ে জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্মাতা বলেন, ‘আমি ইয়াসমিন বলছির কাজ দিনাজপুর ও ঢাকার আউটডোরে হবে। এখন আমরা সব গুছিয়ে নিচ্ছি। পরিবেশ অনুকূলে আসামাত্র শুটিংয়ে যাব।’

প্রসঙ্গত, ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি বাসে দিনাজপুর যাচ্ছিলেন ইয়াসমিন আক্তার নামের এক কিশোরী। বয়স ছিল আনুমানিক ১৬ বছর। যাওয়ার পথে সেখানকার দশমাইল মোড় এলাকায় নেমেছিলেন তিনি। অপেক্ষা করছিলেন পরবর্তী বাসের জন্য। সেসময় টহল পুলিশের একটি ভ্যান আসে এবং একপ্রকার জোর করেই তাকে দিনাজপুরে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে কিশোরীটির মরদেহ পাওয়া যায় গোবিন্দপুর নামক জায়গায়। 

ওই ঘটনায় সারাদেশের মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়। দিনাজপুরবাসীরা আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়। সেসময় নিহত হন ৭ জন মানুষ, আহত দুই শতাধিক। আমি ইয়াসমিন বলছি সিনেমাটি মূলত এই ঘটনা অবলম্বনেই নির্মিত হবে। যেখানে মূল চরিত্রে অভিনয় করবেন মিম।