তৎকালীন সেন্সর বোর্ডে আটকে পড়া ছবিগুলো নিয়ে অনেক দিন ধরেই চলচ্চিত্রাঙ্গনে চাপা-উদ্বেগ রয়েছে। তবে অর্ন্তবর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠিত হওয়ার পর থেকেই বিগত সরকারের সময়ে আটকে থাকা ছবিগুলোর প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সার্টিফিকেশন বোর্ড ঘিরে চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে যে, ‘প্রদর্শন অযোগ্য’ হিসেবে বিবেচিত সেসব ছবি এবার ছাড়পত্র পেতে পারে।
সেন্সর খড়গে পড়া ছবিগুলোর মধ্যে ‘রানা প্লাজা’, ‘শনিবার বিকেল’, ‘মর থেংগারি (মাই বাইসাইকেল)’, ‘নমুনা’, ‘কাঠগোলাপ’, ‘মনোলোক’, ‘অমীমাংসিত’ ও ‘অন্যদিন...’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে কোনোটি আইনি মারপ্যাঁচে, আবার কোনোটি অজানা কারণে আটকে দিয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
দীর্ঘ ৯ বছর আগে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘রানা প্লাজা’ সিনেমাটির। তবে সেসময়ে সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র মেলেনি। সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বানানো বলেই এ নিয়ে জটিলতা বাঁধে। চলচ্চিত্রটিতে নানা ভীতিকর দৃশ্য দেখানোর অভিযোগ করে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের (বিজিএমইএ) সভাপতি সিরাজুল ইসলাম।
যদিও কিছু দৃশ্য কর্তন সাপেক্ষে রানা প্লাজা মুক্তির অনুমতি দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। কিন্তু এরপর রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ হয় বিজিএমইএ। তখন রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে চলচ্চিত্রটির মুক্তি সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করা হয়। তারপর নিয়মানুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবারও আপিল করেন নির্মাতা। সিনেমাটি বর্তমানে এই অবস্থায় উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করবেন বলে আশাবাদী পরিচালক নজরুল ইসলাম। ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে তিনি বলেন, ‘সেন্সর সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠিত হওয়ার পর আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করছি, তথ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন কর্মকর্তাদের অবিচারের ন্যায়বিচার পাব। আমার সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, এমনটা যদি হতে থাকে, তাহলে এই দেশে ভালো কোনো নির্মাতা ভালো কোনো ছবি বানাতে এগিয়ে আসবে না।’
প্রায় ১৫ বছর আগে নির্মিত সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র ‘নমুনা’ নির্মাণ করেছেন স্থপতি ও নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝর। ‘আহা’ দিয়ে প্রশংসা কুড়ানোর পর এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ছবি, যা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তৈরি। তবে সেন্সর বোর্ড থেকে এই ছবির সিংহভাগ গল্প পরিবর্তন করতে বলা হয়েছিল এবং ‘অসম্পূর্ণ’ দাবি করে নির্মাতার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল তথ্য মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে নির্ঝরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। বলে কী লাভ? এর আগেও অনকে রিপোর্ট করেছেন সাংবাদিকরা, কিন্তু কোনো কাজের কাজ হয়নি। এখন মামলা চলছে, জানি না সিনেমাটির ভবিষ্যৎ কী?’
সার্টিফিকেশন বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মোস্তফা সরয়ার ফারকীর শনিবার বিকেল সিনেমাটি আপিল কমিটি কর্তৃক পুনঃনিরীক্ষণের জন্য প্রক্রিয়াধীন। তরুণ নির্মাতা অং রাখাইনের মর থেংগারি (মাই বাইসাইকেল) সিনেমাটি তৎকালীন সেন্সর বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রযোজক কর্তৃক বাস্তবায়ন করে জমা দেওয়া হয়নি। এদিকে, নির্মাতা সাজ্জাদ খানের কাঠগোলাপ ছবিটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি কর্তৃক পরীক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছে।
নির্মাতা রায়হান খানের মনোলোক সিনেমাটিও একইভাবে বছরের পর বছর আটকে রয়েছে। ২০২৩ সালে এ নিয়ে তৎকালীন বোর্ডের উপ-পরিচালক মো. মঈনউদ্দীন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে পর্দার চরিত্রগুলোর সংলাপে ব্যবহৃত তথ্য-সমূহের বিধিসম্মত দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকেই সেটির মুক্তি অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়ায়। সিনেমাটি নিয়ে পরিচালকের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অচেতন মনে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক প্রবাহ এবং স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণে সংঘটিত রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের কাল্পনিক বিশ্লেষণে ছবিটি তৈরি।’
এ ছাড়া রায়হান রাফীর ‘অমীমাংসিত’ ছবিটি আপিল কমিটিতে পরীক্ষণের জন্য প্রক্রিয়াধীন। অন্যদিকে, কামার আহমাদ সাইমনের ‘অন্যদিন...’ চলচ্চিত্রটি তৎকালীন সেন্সর বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রযোজক কর্তৃক বাস্তবায়িত করে জমা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া সম্প্রতি অনন্য মামুনের আটকে থাকা ‘মেকআপ’ সিনেমাটিকে সার্টিফিকেশন বোর্ডও প্রদর্শনী অযোগ্য বলে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে এ নিয়ে নির্মাতার ভাষ্য, ‘মেকআপ সিনেমাটি নতুন করে সার্টিফিকেশন বোর্ডে জমা দেয়া হবে। আশা করি, সার্টিফিকেশন বোর্ড সারা দেশে প্রদর্শন অনুমতি দেবে। গত সরকারের সময় সেন্সর বোর্ডের কিছু সদস্য ইচ্ছা করে চলচ্চিত্রটি বাতিল করেছিল।’
আটকে থাকা সিনেমাগুলো কেন এখনও দেখা হচ্ছে না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে সার্টিফিকেশন বোর্ডের বর্তমান সদস্য নির্মাতা খিজির হায়াত খান বলেন, ‘এখানে কিছু সিনেমা আদালতে বিচারাধীন। তাই আদালত যদি আমাদের নির্দেশনা না দেন, তাহলে আমরা সেগুলো দেখতে পারি না। তবে সার্টিফিকেশন বোর্ড এখন নিয়মিত নতুন সিনেমাগুলো দেখছে, যেন চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে সিনেমা মুক্তিতে কোনো স্থবিরতা তৈরি না হয়। ইতিমধ্যে কয়েকটি সিনেমাকে ছাড়পত্রও দেওয়া হয়েছে।’