একবার হারিয়ে গিয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা

১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সদিয়ায় (বর্তমানে অরুণাচল) ভূপেন হাজারিকার জন্ম। পিতা-মাতার দশ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সকলের বড়। বাবা নীলকান্ত হাজারিকা ছিলেন বংশীবাদক, একইসঙ্গে স্কুল শিক্ষক। মা শান্তিপ্রিয়া দেবী ছিলেন গৃহিনী। খুব ভালো গান গাইতেন। 

পরে সংগীতশিল্পীর পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসামের গুয়াহাটিতে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষা মেঘালয় সীমান্তের কাছাকাছি এই শহরেই ভূপেন হাজারিকার বেড়ে ওঠা। তবে সুযোগ পেলেই ফিরে যেতেন জন্মস্থান সদিয়ায়। সেখানেই একবার জন্ম মুহূর্তে দাই হিসেবে যাঁরা তাঁর মায়ের সহায়তায় ছিলেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। জন্ম ও ছোটবেলা সম্পর্কে তাঁদের কাছ থেকে অদ্ভুত কিছু ঘটনা শুনেছিলেন তিনি। তার মধ্যে একটি ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া। ভূপেনের বাবা স্থানীয় সাহেব কমিশনারের মেমসাহেবকে অসমীয়া পড়াতেন। সেই পরিচিতি থেকে একবার ভূপেনকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য সাহেব তাঁর বাচ্চার প্যারামবুলেটরটি দিয়েছিলেন। স্থানীয় জনজাতি মেয়েরা তাঁকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।

আত্মজীবনীগ্রন্থ ‘আমি এক যাযাবর’-এ সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে ভূপেন বলেন, ‌‘একদিন আমি নাকি হারিয়ে গেলাম। আমিও নেই, আমার প্যারামবুলেটরও নেই। বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেছে। বাবা কমিশনার সাহেবকে আমার হারিয়ে যাওয়ার কথা জানালেন। তিনি তিনসুকিয়ার পুলিশকে সদিয়ায় এনে আমায় খুঁজে দিতে বললেন। তিনদিন-তিনরাত আমায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনদিন পরে ওই জনজাতি মেয়েরা হাসতে হাসতে প্যারামবুলেটর করে আমায় বাড়ি ফিরিয়ে দিল।’      

‘মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই তিনদিন ও কী খেয়েছিল? ও তো আমার দুধ ছাড়া কিছুই খায় না। তাঁরা নাকি তখন বলেছিল, কেন, পাহাড়ে যত মা আছে, এই তিনদিন ও তাঁদেরই দুধ খেয়েছিল।’

মূলত সেই সদিয়াতেই ভূপেন পেয়েছিলেন সংগীতের ঐশ্বর্য। লোকসংগীত তথা সংগীতের মাধ্যমে সমাজকে চেনার কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছেন। পরিচিতি পেয়েছেন ‘ব্রহ্মপুত্রের চারণকবি’ বলেও। 

এই গায়ক পড়াশোনা করেছেন আসামের গুয়াহাটি ও ধুবড়িতে। পরে ভর্তি হন বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫২ সালে নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে অর্জন করেন পিএইচডি ডিগ্রি। কিন্তু এর অনেক আগেই সংগীত জীবনের শুরু। ১৯৩৯ সালে অহমীয়া ভাষায় প্রযোজিত দ্বিতীয় ছায়াছবি ‘ইন্দ্রমালতী’র জন্য প্লেব্যাক করেন ভূপেন হাজারিকা। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১২ বছর!

কিশোর কুমার ও লতা মঙ্গেশকরদের নিয়ে রিহার্সালে ভূপেন হাজারিকা। ছবি: এক্স

ছোটবেলাতেই নানা গুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন ভূপেন হাজারিকা। গীতিকার আনন্দীরাম দাস, পার্বতী প্রসাদ বড়ুয়া ও কমলানন্দ ভট্টাচার্যের মাধ্যমে স্থানীয় বরগীত, গোয়ালপাড়ার গান, চা–মজদুরের গান, বিহুগীতসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন ও প্রভাবিত হন। পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতিপ্রসাদের প্রভাব পড়েছিল ভূপেনের মনে। হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল সংগীত ও উচ্চাঙ্গ নৃত্যের ওস্তাদ বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার হাত ধরেই সংগীতে পথচলার শুরু এই গায়কের। এছাড়া আমেরিকায় থাকার সময়েই তিনি পরিচিত হয়েছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী পল রবসনের সঙ্গে। যাঁর অনেক বিশ্ববিখ্যাত গানের ভারতীয় রূপান্তর করেছেন ভূপেন হাজারিকা।

সংগীত ও চলচ্চিত্র নিয়ে নানা নিরীক্ষা আর ভাবনা ছিল ভূপেন হাজারিকার। সেই সময়টা ধরে তিনি বলেছিলেন, ‘ছোট, বড়, মাঝারি পর্দার প্রভাব বর্তমানে মানুষের ওপর বিশেষভাবে পড়ছে। মাইক্রোফোন আর ক্যামেরা এখন পৃথিবীকে পরিচালিত করছে। এখন রবীন্দ্রসংগীত, শান্তিদেব ঘোষ কিংবা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় কী রকমভাবে পরিবেশন করছেন, এসব নিয়ে আর ভাবার কোনো অর্থ হয় না। কারণ এখন তো আর রবীন্দ্রসংগীত ভালো-খারাপ করার কোনো উপায় নেই। কেউ যদি খারাপভাবে তাকে পরিবেশন করে তাহলে বলতে হবে এই গান তুমি ঠিকমতো গাইতে জানো না। অতীতে যদি পঞ্চাশ হাজার মানুষ রবীন্দ্রসংগীত শুনতেন তাহলে এখন দশ লাখ মানুষ সেই গান শুনবেন। খারাপ জিনিসকে ভালো মোড়কে মুড়ে পরিবেশন করলে কখনও কখনও তা বিক্রি হয়ে যায়।’

দেশ-বিদেশ চষে বেড়ানো এই যাযাবর মানুষটি একসময় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। জীবনের শেষদিকে ডানপন্থী বিজেপির প্রতি সমর্থন দেন। ২০০৪ সালে গুয়াহাটি থেকে মনোয়ন নিয়ে নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছিলেন। পরে অবশ্য এ জন্য তিনি ভুলও স্বীকার করেন। নির্বাচনে তিনি তৃতীয় হয়েছিলেন। তবে আজন্ম তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, শোষিত-সংগ্রামী মানুষের প্রতিনিধি। 

ভূপেন হাজারিকার শেষকৃত্যে মানুষের ঢল নেমেছিল। ছবি: রয়টার্স

২০১১ সালের ৫ নভেম্বর প্রয়াত হন শিল্পী ভূপেন হাজারিকা। একই বছর তাঁকে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’ পদকে ভূষিত করা হয়। সংগীত ক্যারিয়ারে সলিল চৌধুরী, লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমারদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। 

ব্যক্তিগত জীবনে কানাডায় বসবাসরত প্রিয়ম্বদা প্যাটেলকে বিয়ে করেন ভূপেন হাজারিকা। তাঁদের একমাত্র সন্তান তেজ হাজারিকা। যদিও এই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। অসমীয় পরিচালক কল্পনা লাজমিকে বেছে নিয়েছিলেন জীবনসঙ্গী হিসেবে।