কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তাকে

চৈত্রের চতুর্থ দিবস। রোদ এখনো ততটা প্রখর নয়। হঠাৎ হাওয়ার ঘূর্ণিও অত প্রবল নয়। রাতগুলো এখনো হাঁসফাঁসের নয় তেমন। এই মধ্যবসন্তের হাওয়া, পাতাঝরা দুপুরগুলো কেমন এক বিরহ–আঙুল বুলিয়ে যায় মনে। আচ্ছা মন কোথায় থাকে? খুব গভীরে যেখানে ‘সরলতার প্রতীমা’ করে নিভৃত যাপন, সেখানেই কি মনের বাস? সেই নিভৃত কোণের গল্প সুরে সুরে জানিয়ে, হাজারো মনে তার অনুরণন তুলে তবু মানুষ হারিয়ে যায়। এতটা দূরে যে, তাকে আর ফেরানো যায় না। এই যে অক্ষমতা—এই যে বিরহ, তারও তো গল্প বলে গেছেন তিনি। বলতে বলতে, গাইতে গাইতে নিজেই পাড়ি দিয়েছেন, ততটা দূরে, যতটা দূর থেকে আর ‘ফেরানো গেল না তাকে’।

কোনো কারণ, কোনো বাঁধন তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তিনি খালিদ। এই মধ্যবসন্তে এক বিলাপের আবহ গড়ে তিনি চলে গেলেন দূরে। নিজের গানগুলোর মতোই মনের বড় নিভৃত অঞ্চলে ঘাঁই মেরে চলে গেলেন তিনি।

কত কথা মনে পড়ে যায়। একেকটি চলে যাওয়া কত কত স্মৃতিকে টেনে নিয়ে আসে চোখের সামনে। মনে হয়—এখন এই তো সেই টেপরেকর্ডার, যার রং লাল, যার পেটে ক্যাসেট সেঁধিয়ে দিলে তার কালো কালো ফিতা থেকে বেরিয়ে আসবে একের পর এক গান। 

আশির দশকের শেষভাগ থেকে মধ্য নব্বই। তারপর উধাও। কত কত শিল্পী। ব্যান্ড সংগীতের সে এক সময় বটে। কত কত ব্যান্ড দল, কত কত আয়োজন! একক। আছে মিক্সডও। সংগীতা, সাউন্ডটেক, সারগাম—কত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এতেও না হলে আছে অন্য পথ। কখনো পছন্দের গানগুলো একসাথে পেতে পাড়ার বা নির্ভরযোগ্য কোনো ক্যাসেটেরম দোকান থেকে তালিকা করে গান রেকর্ড করে নেওয়া। বাংলা ব্যান্ড সংগীতের সেই সময়ে এমন তালিকায় অবধারিতভাবে জায়গা করে নিয়েছেন খালিদ।

চাইমের খালিদ। যে ব্যান্ড এসেছিল উচ্চকিতর বদলে একটা মৃদুমন্দ হাওয়া বইয়ে দিতে শ্রোতাদের হৃদয়ে, কানে। দিয়েছিলও। আর এটা এতটাই যে, চাইমের লিড ভোকাল খালিদ আলাদা করে জায়গা করে নিলেন তরুণদের মধ্যে।

উঠতি বয়ঃসন্ধির না বালক, না কিশোর থেকে শুরু করে কৈশোর, তারুণ্য ডিঙিয়ে যৌবনের দ্বারে কড়া নাড়া সবাই সেই বিরহ–মধুর সুর ও কথায় বুঁদ হয়েছিল অপ্রতিরোধ্যভাবে। সদ্য প্রেমে পড়া তরুণ–তরুণীর বুকে কণ্ঠের মাধুর্যে এক অব্যর্থ ঘাঁই বসিয়ে দিতে বেশ পারঙ্গম ছিলেন খালিদ।

জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে বিশ্বের আর সব তরুণ–যুবার মতো এ দেশের তরুণ–যুবারাও প্রেমে পড়েন। হ্যাঁ প্রেমে পড়েই মানুষ। কারণ, এ থেকে উত্তরণের পথ নেই। এ তো এক বিকট ফাঁদ, যেখানে না চাইতেই আটকে যেতে হয়। আটকে গিয়ে তরুণ সেই প্রাণগুলো আইঢাই করে। কেউ সফল হয়, কেউ ব্যর্থ।

কী অদ্ভুত যে, এই সফল ও ব্যর্থ—উভয়কেই এক কাতারে এনে নিবিষ্ট শ্রোতা বানিয়ে ফেলেছিলেন খালিদ। কী করে? ওই যে বললাম প্রেম এক বড় ফাঁদ, যাতে আটকালে রক্ষে নেই। যে সফল হলো, সেও বিরহী হয় ক্ষণে ক্ষণে। আর যে ব্যর্থ, পরের কোকিলটি ডেকে ওঠার আগ পর্যন্ত বিরহের সীমা সে ডিঙোবে কী করে! ফলে উভয়কেই আশ্রয় খুঁজতে হয়। নব্বইয়ের সেই থরথর প্রেম, বহু কসরতে প্রেমাস্পদের সান্নিধ্য পাওয়ার বাস্তবতার সেই কালে এই আশ্রয় হয়ে কত দুরু দুরু বুকে বেজেছে খালিদের গান, তাঁর কণ্ঠ। কী ভীষণ এক দক্ষতা! 

এই শেষ আশি ও নব্বইয়ের সেই কিশোর–তরুণেরা এখনো বেঁচে। শুধু চলে গেলেন তাঁদের বুকের ক্ষরণের সাথে অজস্রবার সঙ্গত দেওয়া সেই কণ্ঠের মানুষটি। ‘কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তাকে’; ‘কোনো বাঁধনেই বাঁধা তো গেল না তাকে’। 

হ্যাঁ, খালিদের গাওয়া জনগ্রিয় সেই গানের ভাষায়ই বলতে হয়—‘সে যে হৃদয় পথের রোদে/ একরাশ মেঘ ছড়িয়ে/ হারিয়ে গেল নিমিষেই’। না, ঠিক নিমিষেই বলা যাবে না হয়তো। তবু তাঁর এই হঠাৎ চলে যাওয়ায় বারবার তাঁর গানের এই অংশটিই বাজছে কানে। যেন কোন দূর থেকে, নাকি একেবারে হৃদয়ের গভীর কোনো অঞ্চলে, যেখানে থেকে যাবে তাঁর ‘সরলতার প্রতীমা’।