সেসময় কোথাও আশ্রয় পাচ্ছিলাম না: রাহুল আনন্দ

বর্তমানে সপরিবারে ফ্রান্সে বসবাস করছেন জনপ্রিয় গানের দল ‘জলের গান’র সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও বাদ্যযন্ত্রী রাহুল আনন্দ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দিনে (৫ আগস্ট) রাজধানীর ধানমণ্ডিতে এই শিল্পীর বাড়ি ও স্টুডিওতে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। সেদিন স্ত্রী চিত্রশিল্পী উর্মিলা শুক্লা ও ১৩ বছরের পুত্র তোতাকে নিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। তারপর যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, ৭ আগস্ট সেই বাড়িও হামলার শিকার হয়েছিল—এমনটাই জানালেন তিনি। 

শুক্রবার (৭ আগস্ট) দিবাগত রাতে সামাজিকমাধ্যমে ‘৭ আগস্ট’ শীর্ষক এক দীর্ঘ পোস্টে সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভরা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন এই শিল্পী। তিনি লেখেন, ‘দ্বিতীয়বার আগুনের ভেতর থেকে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বের হয়েছি এই দিন, ৭ আগস্ট ২০২৪। জ্বি, ঠিকই পড়েছেন ২য় বার! সেসময়টায় কোথাও আশ্রয় পাচ্ছিলাম না। সবাই কেমন ভয়ে কিংবা দ্বিধায় আমাদের নিতে চাইছিল না।’

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে একফ্রেমে রাহুল ও তাঁর পরিবার। ছবি: সংগৃহীত

ভয়াল সেই দিনটির চিত্র তুলে ধরে রাহুল লেখেন, ‘‘মানুষের ঊর্ধ্বে উঠে এক বন্ধু রাত ২.৩০ মিনিটে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল, আশ্রয় দিয়েছিল ৫ আগস্ট। দুইদিনও টিকেনি সেই আশ্রয়। বিল্ডিংয়ের নিচের কলাপ্সিবল গেটে তালা আটকে আগুন দিয়েছিল। আমরা ছিলাম তৃতীয় তলায়। গ্যারেজে দুইটা গাড়িতে ও ২য় তলায় আগুন দিয়েছিল। বাঁচবো ভাবিনি। বন্ধুর কন্যা আর নিজের স্ত্রী-পুত্রের হাত ধরে মৃত্যুর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা! দাঁড়ানোও যাচ্ছিলো না ফ্লোর এতোটাই গরম হয়ে উঠছিল। সেদিন জেনেছি—সবচেয়ে বড় আর ভয়ঙ্কর দৈত্যের নাম ‘ধোঁয়া’! কালো ভারী ধোঁয়ায় নীল হয়ে গিয়েছিল আমার শিশুপুত্র। টের পাচ্ছিলাম দমের সাথে ধোঁয়া ঢুকে শ্বাসনালী পুড়িয়ে দিচ্ছিলো, ভেতরটা তীব্রভাবে জ্বলছিল। বন্ধুকন্যার ভীষণ সাহসে ভর করে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাই সেদিন! এই মেয়ের কাছে আমার সারাজীবনের ঋণ। তাকে বন্ধুকন্যা না ভেবে এখন নিজের কন্যা ভাবি।’’

যোগ করে তিনি বলেন, ‘‘সেই ভয়ঙ্কর কালো ধোঁয়ার ভেতর একটা সংলাপ শুধু কানে গাঁথছিল। আমার স্ত্রী উর্মিলা ফ্যাঁস-ফ্যাঁসে, গোঁঙানোর মতো বলছিল—‘রাহুল, আমি আর পারছি না!’ সেখান থেকে বন্ধুরা (যে কয়জন তখনও মানুষ ছিল) এসে নিয়ে যায় অন্য আশ্রয়ে... সেই থেকে এখন পর্যন্ত নবম আশ্রয়ে আছি। ঘর বাঁধিনি এখনও... উড়ছি আর ঘুরছি। পৃথিবী দেখছি... বাউলের বেশে... মানুষ ভালোবেসে।’’

সেই কঠিন সময় নিয়ে এবারই প্রথম মুখ খুললেন রাহুল আনন্দ। পোস্টে তিনি এ বিষয়ে আবারও কলম ধরবেন—এমনটাও উল্লেখ করেন। সবশেষে বলেন, ‘এই প্রথম লিখতে শুরু করেছি, সব লিখব। যা লিখব, সত্য লিখব এই ফেসবুক আদালতে। তাতে অনেকের অপ্রিয় হবো, সন্দেহ নেই। তবুও সত্যটুকু না জানালে, দায়ী থাকব আমার পূর্বপুরুষ আর আগামী প্রজন্মের কাছে।’

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ‘জলের গান’র সদস্যদের নিয়ে রাজধানীর রবীন্দ্রসরোবরে দাঁড়িয়েছিলেন রাহুল আনন্দ। কিন্তু তারপরও ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের কাছে এ শিল্পীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় তাঁর বসতবাড়ি এবং সংগ্রহে থাকা হাজার হাজার হস্তনির্মিত বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে, ২০২৩ সালে ঢাকা সফরে এসে রাহুলের সেই বাড়িতে ঘুরতে গিয়েছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এখন তা ছাইভস্ম ছাড়া আর কিছুই নয়।