বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু শিল্পীর পরিচয় নয়, একেকটি অধ্যায়। আইয়ুব বাচ্চু তেমনই এক নাম। গিটার হাতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে যিনি এক প্রজন্মকে শিখিয়েছেন—গান শুধু শোনার বিষয় নয়, অনুভব করারও বিষয়। আজ সেই কিংবদন্তি শিল্পী, গিটারবাদক ও সুরকার আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে আজ ৬৫ বছরে পা দিতেন তিনি।
কিন্তু বয়সের হিসাব তার ক্ষেত্রে যেন বড়ই অপ্রাসঙ্গিক। কারণ আইয়ুব বাচ্চু চলে গিয়েও থেমে যাননি। তার গান থামেনি, গিটারের সুর থামেনি, থামেনি তাকে ঘিরে মানুষের আবেগও।
‘এখন অনেক রাত’, ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘রুপালি গিটার’, ‘কষ্ট’—এমন অসংখ্য গান বাংলা সংগীতের শ্রোতাদের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। তার কণ্ঠে যেমন ছিল গভীর আবেগ, তেমনি গিটারে ছিল এক ধরনের নিজস্ব ভাষা। সেই ভাষা কখনো ছিল বিষণ্ন, কখনো বিদ্রোহী, কখনো প্রেমময়; কিন্তু সবসময়ই ছিল আইয়ুব বাচ্চুর নিজস্ব।
গিটার হাতে বদলে দিয়েছিলেন মঞ্চ
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের বিকাশে আইয়ুব বাচ্চুর অবদান শুধু একজন গায়ক বা গিটারবাদক হিসেবে বিচার করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ সংগীতশিল্পী। গানের কথা, সুর, কণ্ঠ আর গিটার—সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজের আলাদা সংগীতভুবন।
মঞ্চে তার উপস্থিতিও ছিল ব্যতিক্রমী। গিটার হাতে আইয়ুব বাচ্চু যেন অন্য এক মানুষ। তার বাজানোর ভঙ্গি, কণ্ঠের ওঠানামা আর দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে কনসার্টকে তিনি পরিণত করতেন এক আবেগঘন অভিজ্ঞতায়।
বিশেষ করে তরুণদের কাছে তার জনপ্রিয়তা ছিল বিস্ময়কর। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় পর্যন্ত অসংখ্য তরুণের হাতে গিটার উঠেছে আইয়ুব বাচ্চুকে দেখে। অনেকেই তাকে শুধু প্রিয় শিল্পী হিসেবে নয়, সংগীতের পথচলার অনুপ্রেরণা হিসেবেও নিয়েছেন।
এলআরবির আইয়ুব বাচ্চু
১৯৯১ সালে এলআরবি গঠনের মধ্য দিয়ে আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবন পায় নতুন মাত্রা। ব্যান্ডটির গান দ্রুত শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রক সংগীতকে বাংলাদেশের মূলধারার শ্রোতাদের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এলআরবির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই যাত্রার অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু।
তার কণ্ঠে রক গান যেমন প্রাণ পেয়েছে, তেমনি ব্যালাডধর্মী গানেও তিনি দেখিয়েছেন নিজের অসাধারণ সংবেদনশীলতা। ফলে তার সংগীত শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘরানার শ্রোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব, জীবনসংগ্রাম—মানুষের অনুভূতির নানা স্তর উঠে এসেছে তার গানে।
‘সেই তুমি’ থেকে ‘রুপালি গিটার’
আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি মানুষের খুব পরিচিত অনুভূতিগুলোকে অসাধারণ সহজতায় গানে রূপ দিতে পারতেন।
‘সেই তুমি’তে হারানোর বেদনা, ‘এখন অনেক রাত’-এ নিঃসঙ্গতা, আবার ‘রুপালি গিটার’-এ শিল্পীর নিজের জীবন ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা—প্রতিটি গানের মধ্যেই যেন তার জীবনের কোনো না কোনো অনুভূতির ছাপ রয়েছে।
তার গান তাই শুধু একটি সময়ের গান হয়ে থাকেনি। নতুন প্রজন্মও এখনো তার গান শুনছে, গাইছে, গিটারে বাজাচ্ছে। এটাই হয়তো একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য—সময় পেরিয়ে গেলেও তার সৃষ্টি নতুন মানুষের কাছে নতুন করে অর্থ খুঁজে পায়।
চলে গিয়েও থেকে যাওয়ার গল্প
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর না ফেরার দেশে চলে যান আইয়ুব বাচ্চু। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। ভক্তদের কাছে যেন বিশ্বাস করাই কঠিন হয়ে পড়ে—যে মানুষটি এতদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে গিটার হাতে গান শুনিয়েছেন, তিনি আর নতুন কোনো গান নিয়ে ফিরবেন না।
কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু তার শিল্পকে থামাতে পারে না। আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রেও সেটিই সত্যি হয়েছে।
তার গান এখনো রেডিওতে বাজে, ইউটিউবে মানুষ শোনে, নতুন প্রজন্ম গিটারে তার গান শেখে। কোনো কনসার্টে তার গান উঠলে দর্শকের কণ্ঠ মিলিয়ে যায় গানের সঙ্গে। ‘সেই তুমি’ বাজলে পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে আসে কারও মনে, ‘এখন অনেক রাত’ শুনে কেউ হয়তো নিজের একাকিত্বের সঙ্গে নতুন করে দেখা করে।
এই যে এত বছর পরও একজন শিল্পীর গান মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতির অংশ হয়ে থাকে—এটাই অমরত্ব।
রুপালি গিটারটি আজও ঝুলে আছে
আইয়ুব বাচ্চুর সবচেয়ে পরিচিত প্রতীকগুলোর একটি ‘রুপালি গিটার’। সেটি যেন তার সংগীতজীবনেরই প্রতিচ্ছবি। ঝলমলে মঞ্চ, হাজারো দর্শক, হাতে গিটার আর কণ্ঠে গান—এই দৃশ্য বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে আছে।
আজ তার জন্মদিনে তাই প্রশ্নটা শুধু ‘আইয়ুব বাচ্চু কত বছর বয়সে পৌঁছাতেন’—তা নয়। বরং প্রশ্ন হতে পারে, তিনি আমাদের সংগীতে কতটা জায়গা তৈরি করে গেছেন।
তার উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। কোনো তরুণের হাতে গিটার দেখলেই পাওয়া যায়, কোনো পুরোনো গানের প্লেলিস্টে পাওয়া যায়, কোনো কনসার্টে দর্শকের সম্মিলিত কণ্ঠে পাওয়া যায়। আর পাওয়া যায় সেই মানুষগুলোর স্মৃতিতে, যারা তার গান শুনে কৈশোর পেরিয়েছে, প্রেমে পড়েছে, বিচ্ছেদ সামলেছে কিংবা নিঃসঙ্গ রাতে সঙ্গী খুঁজে পেয়েছে তার কণ্ঠে।
আইয়ুব বাচ্চু নেই—কিন্তু তার গান আছে। তার গিটার আছে। তার সুর আছে। আর আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা স্মৃতি।
তাই জন্মদিনে আইয়ুব বাচ্চুকে মনে করা মানে শুধু একজন কিংবদন্তিকে স্মরণ করা নয়; বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়কে আবার ছুঁয়ে দেখা।