একটা শান্ত, নিস্তরঙ্গ, নিয়মিত জীবন। তাতে ঢেউ থাকে, কিন্তু সুনামি নেই। হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই—তাঁরা মরে যেতে থাকলেন। শুধু নিশ্বাস নিতেই একেকজন ঢলে পড়তে থাকলেন কিছু বুঝে ওঠার আগেই। মানুষের সেই সংখ্যাটি হাজার হাজার। ভাবুন একবার, যেখানে তাকাচ্ছেন সেখানেই মানুষের লাশ। আর এর উল্টোদিকেই গুটিকয়েক মানুষ নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে বাঁচাতে চাইছিলেন অন্যদের।
এমন একটি প্রেক্ষাপটেই তৈরি হয়েছে ‘দ্য রেলওয়ে মেন—দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব ভোপাল ১৯৮৪’। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে এই লিমিটেড ওয়েব সিরিজ। পরিচালক শিব রাওয়েল। এই সিরিজটি দিয়েই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অভিষেক হয়েছে যশ রাজ ফিল্মসের। অর্থাৎ ওটিটির জন্য এখন থেকে হয়তো নিয়মিতই সিরিজ বানানোর কাজটা করতে থাকবে ভারতের এই নামী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। এবং বলাই যায় যে, অভিষেকেই বাজিমাত করেছে ‘দ্য রেলওয়ে মেন’। নির্মাণ ও অভিনয়—দুটিতেই লেটার মার্ক দেওয়া যায় সিরিজটিকে।
১৯৮৪ সালে ভারতের ভোপালে কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় যে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিয়েই এগিয়েছে এই সিরিজের গল্প। শুরুটা বেশ সাদামাটা। রোজকার জীবনের গল্প ধারাবাহিকতা মেনেই এগিয়েছে। একেক মানুষের একেক ধরনের জীবন। কারও হয়তো দুঃস্বপ্নে ঘুম ভাঙে বারবার। আবার কারও মনে বইতে থাকে প্রিয়জন হারানোর ঝড়। কেউ আবার সত্য প্রতিষ্ঠায় লড়তে থাকে মরিয়া হয়ে। এই সব চরিত্রই একটা বিন্দুতে এসে এক হয়ে পড়ে। নিজের জীবন খাদে ফেলে তখন অন্যের জীবন বাঁচানোই যেন হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য।
‘দ্য রেলওয়ে মেন’ সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। চার পর্বে বলা হয়েছে গল্পটি। পর্বগুলোর সময়সীমা ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়েছে এবং এটি বেশ সুন্দরভাবে কার্যকর করেছেন পরিচালক। তবে হ্যাঁ, এই সিরিজ দেখতে বসলে প্রতি পর্ব দেখার জন্য অন্তত এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ রাখতেই হবে আগ্রহী দর্শকদের।
সত্য ঘটনা নিয়ে তৈরি যেকোনো সিনেমা বা সিরিজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, ওই সত্য ঘটনাটির পর্দায় সার্থক চিত্রায়নের বিষয়টি। স্বাভাবিকভাবেই ওই সময়ের অবকাঠামো দেখাতে তৈরি করা সেটে আশ্রয় নিতে হয়েছে নির্মাতাকে। আবহ ফুটিয়ে তুলতে কৃত্রিমতাকে অবলম্বন করা ছাড়া কোনও উপায়ও ছিল না। তবে চোখে বেমানান লাগেনি খুব একটা। কিছু ঘাটতি থাকলেও সেসব ঢেকে দিয়েছেন অভিনয়শিল্পীরা। রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টারের চরিত্রে ছিলেন অভিজ্ঞ অভিনেতা কে কে মেনন। তাঁর অভিনয় নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। সব সময়ের মতো এবারও তিনি নিজের সুনামের অবিচার হতে দেননি।
কে কে মেননকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন ইরফান খানের সুপুত্র বাবিল খান। প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা পরিবারের শেষ অংশটুকু বাঁচানোর তাগিদ—সব অভিব্যক্তি প্রকাশেই বাবিল অনবদ্য ছিলেন। একেবারে ইরফানের অবিকল প্রতিরূপ যেন!
সিরিজে রেলের একরোখা বড় কর্তার চরিত্রে ছিলেন আর মাধবন। তাঁর বসের ছোট্ট চরিত্রে ছিলেন জুহি চাওলা। দুটিতেই তাঁদের জুড়ি মেলা ভার। অভিনয় দক্ষতার দিক থেকে তাঁরা যে ভারী, সেটিই যেন আবার প্রমাণ করলেন জুহি-মাধবন।
এমন একটা সময়ের গল্প ‘দ্য রেলওয়ে মেন’, যে সময়টায় ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল শিখ সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর প্রচণ্ড বিরুদ্ধ পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছিল এই সম্প্রদায়ের মানুষদের। সেই সম্প্রদায়ের প্রতিভূ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মন্দিরা বেদি। স্বল্প দৈর্ঘ্যের চরিত্রেও তিনি ছিলেন সাবলীল। আর সাংবাদিকের চরিত্রে সানি হিন্দুজাকে দেখার পর, আর কোনো মুখচ্ছবিই প্রতিযোগী হতে পারেনি কল্পনায়।
আরেকজনের কথা না বললেই নয়। তিনি হলেন অভিনেতা দিব্যেন্দু। ওয়েব সিরিজ ‘মির্জাপুর’ দিয়ে তিনি দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। সেই জনপ্রিয়তা যে এমনি এমনি হয়নি, তার প্রমাণ দিব্যেন্দু দিয়েছেন ‘দ্য রেলওয়ে মেন’-এ। ধূর্ত যে চরিত্রটিতে তিনি অভিনয় করেছেন, সেটির অর্থ দাঁড়ায় অনেক। এটি এমনই এক ব্যক্তিকে ফুটিয়ে তোলার বিষয়, যে কিনা মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়েও মুফতে অর্থচুরির সুযোগ হাতছাড়া করার লোভ সামলাতে পারে না। শঠতা ও অসততা তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। কিন্তু সেই তিনিই একসময় আটকে পড়ে মানবতার চক্রে। তাতে আর যা-ই হোক, অন্যকে ঠকানো যায় না। বরং নিজেকে অন্যের জন্য উজাড় করে দেওয়াতেই যেন শান্তি।
তবে হ্যাঁ, কিছু অতিনাটকীয়তা এই সিরিজে ছিল। ম্যাজিকাল মোমেন্ট তৈরি করার লোভেই হয়তো তা হয়েছে। ঘরের বাইরে পা রেখে শ্বাস নিতেই সবাই যেখানে লুটিয়ে পড়ছে, সেখানে মুখে পানিতে ভেজানো রুমাল না বেঁধেই একজনের দীর্ঘসময় ছুটে বেড়ানোটা ঠিক কার্যকারণের দিক থেকে সঠিক মনে হয় না। এমন ছোট ছোট আরও কিছু আছে বটে। তবে পুরো সিরিজটি দেখার পর এসব বিষয় ক্ষমা করে দেওয়াই যায়। কারণ পুরোটা দেখার পর দর্শক হিসেবে অন্তত নিজেকে প্রতারিত মনে হবে না আপনার।
শেষটায় সিরিজের একটি সংলাপ টানা যাক। রেলের একরোখা বড় কর্তা মাধবন এক দৃশ্যে বলেছিলেন, ভোপালে যেসব সাধারণ মানুষ অসহায় মৃত্যুর অপেক্ষায় ক্ষণ গুনছেন, তাঁরা আসলে ‘মূর্খ’। কারণ ওই মানুষগুলো হয়তো ভাবছেন, তাঁদের বাঁচাতে কেউ আসবে! কিন্তু তাঁরা জানে না যে, বোধবুদ্ধি থাকা কেউ আসছে না। শুধু কিছু মূর্খ মানুষই সব নিয়ম-নির্দেশ ভেঙে হাজার হাজার মূর্খকে বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ মৃত্যু হতে পারে জেনেও যাঁরা বিপদের পথে পা বাড়ায়, তাঁরা তো মূর্খই – তাই না?