শুরুতেই জানা গেল, সিরিজটি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। বলে দেওয়া হলো, ১৮-এর বেশি বয়সীদেরই স্ক্রিনের সামনে থাকা উচিত, কারণ সিরিজে আছে স্পর্শকাতর আঞ্চলিক ভাষা, সহিংসতা ও মাদকের উপস্থিতি। বিষয়টি দেখে ভালোই লাগল। সৎ মনে দর্শকদের সতর্ক করে দেওয়ার ব্যাপারটি সত্যিই প্রশংসনীয়। এতে অন্তত সংলাপের মধ্যে অস্বস্তিকর ‘টুট’, ‘টুট’ শব্দ শুনে বিরক্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকা যায়। আবার, কী ধরনের কনটেন্ট দেখতে চলেছি, সে ব্যাপারে এক ধরনের পূর্বধারণাও মেলে।
বলছি ‘সিনপাট’-এর কথা। দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে ১১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছে এই অরিজিনাল সিরিজটি।
এর গল্প সম্পর্কে চরকি বলছে, ‘‘সোহেল একজন নিম্নশ্রেণির অপরাধী। সে মাদক ব্যবসা, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। নিজের এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে সে ফাজুকে সঙ্গে নিয়ে নতুন এক শহরে আস্তানা গাড়ে। এখানে এসেও অপরাধ তাদের পিছু ছাড়ে না। সঙ্গে যুক্ত হয় এলাকার নেশাদ্রব্য বিক্রেতা দুরু। এদিকে ধুরন্ধর সাংবাদিক হাবিবুল বাশার তাদের আগের অপরাধের সন্ধান করে এসে পৌঁছায় এখানেও। সবদিক থেকে শুরু হয় ‘সিনপাট’!’’
এ ক্ষেত্রে সিরিজের গভীরে ঢোকার আগে সিনপাট শব্দটির একটি অর্থমূলক ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। পাবনার নগরবাড়ীর আঞ্চলিক একটি প্রচলিত শব্দ হলো সিনপাট। এক কথায়, সিনপাট মানে সিন ক্রিয়েট করা এবং একেবারেই নেতিবাচক অর্থে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ধরুন, আপনারা কয়েক বন্ধু এক জায়গায় একসাথে যাবেন বলে ঠিক করলেন। শেষ মুহূর্তে এক বন্ধু বেঁকে বসে দিল সব ভণ্ডুল করে। হয়তো আর যাওয়াই হলো না। তখন ওই বন্ধু ‘সিনপাট’ করেছে বলেও অভিহিত করা যায়। আসলে সিনপাট শব্দটি আঞ্চলিকভাবে নানা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হয়। এক অর্থে, এটি অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ির সমার্থক তো অবশ্যই।
সিনপাট সিরিজটির পূর্বসূরি হিসেবে শাটিকাপ-এর নাম উল্লেখ করতেই হবে। কেউ যদি সিনপাট এখনও না দেখে থাকেন, তবে তাকে আকৃষ্ট করার জন্য শাটিকাপ নামটিই যথেষ্ট। তরুণ পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম এই দুটি সিরিজেরই নির্মাতা। শাটিকাপ সত্যিকার অর্থেই এই দেশের ওটিটির দুনিয়ায় নতুন স্বাদ নিয়ে এসেছিল। একে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি’র সেরা কনটেন্ট বললেও ভুল হবে না মোটেই। স্থানীয় এক গল্পে স্থানীয় অচেনা অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে দুর্দান্ত ‘শাটিকাপ’ বানিয়েছিলেন তাওকীর। আর সেই ধারাবাহিকতায় এবার এসেছে ‘সিনপাট’।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই সিরিজটি নিয়ে মনে আগ্রহ ছিল তুমুল। কিন্তু যতটা আগ্রহ নিয়ে সিরিজটি দেখতে বসা হয়েছিল, শেষ করে ওঠার সময় সঙ্গী হলো ততটাই হতাশা। শাটিকাপ দেখার পর সেটির দ্বিতীয় সিজন নিয়ে আশা তৈরি হয়েছিল বেশ। গল্পটিও ছিল পূর্ণাঙ্গ। কিন্তু সিনপাট দেখতে বসলে আক্ষেপই সঙ্গী হবে বেশি। বলা হচ্ছে, এটি ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার সিরিজ। ক্রাইম যে আছে, তা ওপরে দেওয়া গল্পের খানিকটা পড়লেই বোঝা যায়। পুরো সিরিজজুড়েই ক্রাইমের কোনো অভাব নেই। কিন্তু শেষ পর্বের শেষাংশের আগমুহূর্ত ছাড়া থ্রিল খুব একটা পাওয়া গেল না। সেই হিসাবে এটি কেন থ্রিলার, সেই প্রশ্নের উত্তর অনুধাবন করা খুবই কঠিন।
পুরো সিরিজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একজন দর্শক দেখতে পাবেন, কিছু ছিঁচকে অপরাধীর ক্রমশ গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ধারাবাহিকতা। এর সঙ্গে কিছু মানবিক দিকও উঠে এসেছে। অপরাধীর জীবনে থাকা অস্পষ্ট প্রেম অথবা সন্তান কিংবা সাবেক পরিবারের সদস্যদের প্রতি অন্ধকার জগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনের নৈকট্যের অনুভূতি, তাদের ভালো থাকা-মন্দ থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা – এই সবও ছোট ছোট আকারে এসেছে সিনপাটে। কিন্তু তাতে গল্পের উদ্দেশ্য বা বিধেয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নটি ঔজ্জ্বলতা হারায় না। যে গল্পটি দেখানো হচ্ছে, সেটি আসলে দর্শককে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারে, গল্পটি প্রবাহিত হতে হতে শেষটায় হাজারো সড়কবাতিতে উজ্জ্বল এক চার রাস্তার মোড়ে এসে দর্শককে ছেড়ে দিল। তখন দর্শকের ওপরই নির্ভর করে যে, সে কোন গন্তব্যটিকে মেনে নেবে। কিন্তু এমন যদি হয় যে, দর্শক পৌঁছে গেল এমন কোনো কানাগলিতে, যেখানে আর সামনে এগোনোর বা নতুন করে ভাবার কোনো উপায়ই নেই। বরং উল্টো চৌরাস্তায় পৌঁছানোর আশা নিয়ে রাস্তায় কানাগলিতে পৌঁছানোকে বিরক্তির উদ্রেককারী হিসেবে মেনে নিয়ে যদি পেছন ফিরতে হয়, তবে তা সত্যিকার অর্থেই সময়ের অপচয় হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং ‘সিনপাট’-এর ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই হয়েছে।
অথচ স্থানীয় গল্পে স্থানীয় অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে দুর্দান্ত একটি আশাবাদ তৈরি করেছিলেন মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম। সিনপাট-এও দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তাঁরা। অভিনয়ের দিক থেকে তাঁরা ছিলেন প্রায় ত্রুটিমুক্ত। বিশেষ করে সোহেল চরিত্রে সোহেল শেখ এবং ফাজু চরিত্রে মোহাম্মদ রিফাত বিন মানিক যে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অসাধারণ। এ ছাড়া দুরু চরিত্রে থাকা জিন্নাত আরা ও হাবিবুল বাশারের চরিত্রে অভিনয় করা শিবলী নোমান যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন।
সাত পর্বের ‘সিনপাট’-এ ক্যামেরার কাজও হাততালি পাওয়ার যোগ্য। কালার গ্রেডিং দারুণ। চিত্তাকর্ষক ছিল সিরিজের শুরুর ইন্ট্রোও। মিউজিক ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও ছিল বেশ উপভোগ্য।
কিন্তু এই সবই তো দিনশেষে কেবল অনুষঙ্গই। এসবের ভরকেন্দ্রে থাকতে হয় একটি উপযুক্ত ও পূর্ণাঙ্গ গল্পকে। আর সেটির অভাবে শোরগোল তুলে আসা ‘সিনপাট’ হয়ে গেল আক্ষরিক অর্থেই সিনপাট! দেখে শেষ করার পর তাই কেবলই আফসোস হতে থাকল যে, এর চেয়ে চুপি চুপি আসা শাটিকাপ ছিল ঢের ভালো।
রেটিং: ২.৫/৫
পরিচালক: মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম
চিত্রনাট্য: ওমর মাসুম, মাইনুল ইসলাম মিলন, মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম, অমিত রুদ্র ও খালিদ সাইফুল্লাহ সাইফ
অভিনয়শিল্পী: সোহেল শেখ, মোহাম্মদ রিফাত বিন মানিক, জিন্নাত আরা, শিবলী নোমান, প্রণব ঘোষ, রাজু আহমেদ, মুস্তাফা শাহরিয়ার রহমান, মো. রাব্বানি অপু প্রমুখ
ভাষা: বাংলা
ধরন: ক্রাইম
মুক্তি: ১১ জানুয়ারি ২০২৪/চরকি
লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক