পরিচালক হিসেবে এটিই কি অঞ্জন দত্তের সেরা কাজ?

মৃণালের ভূমিকায় অঞ্জন। ছবি: এসভিএফঅঞ্জন দত্তের পরিচয় বহুবিধ, বহুমাত্রিক। গানের জন্য অঞ্জন বহুল পরিচিত। চলতি শতকে বেশ কিছু চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন। তবে পর্দায় আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনয় শুরু করেছিলেন গানেরও আগে। সেই গল্পই এবার নতুন করে তুলে আনলেন তিনি। উদ্দেশ্যটা অবশ্য ‘গুরু’ মৃণাল সেনকে শ্রদ্ধার্ঘ্য দেওয়া।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পরিচালক মৃণাল সেন একটি অনন্য নাম। ভারতীয় এই চলচ্চিত্রকার বাংলা ছবির ভাষা বদলে দিয়েছিলেন বললে একেবারেই বাড়াবাড়ি হয় না। উল্টো বলার পরও কেন জানি মন খুঁত খুঁত করে। বোধ হয়, সঠিক অভিধা কি আসলেই দেওয়া হয় এভাবে? তেমন একজন পরিচালকের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটাকেই পর্দায় নিয়ে এসেছেন অঞ্জন দত্ত। টেনেছেন মৃণাল সেনের পরিচালনায় ‘চালচিত্র’ সিনেমায় অভিনয়ের স্মৃতি। এভাবেই তৈরি হয়েছে ‘চালচিত্র এখন’।

মৃণাল সেন। ছবি: সংগৃহীতসম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই’তে এই সিনেমার ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হলো। সেখানে দেখা যাচ্ছে ছবিটি। হইচই বলছে, এটি ড্রামা ঘরানার। ৯০ মিনিট দৈর্ঘ্যের ছবিটি পরিচালনা করেছেন অঞ্জন দত্ত। অভিনয়েও ছিলেন তিনি। তাঁর পাশাপাশি ছিলেন শাওন চক্রবর্তী, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, সুপ্রভাত দাস, শুভাশিষ মুখার্জি, মেঘলা দাশগুপ্ত প্রমুখ। এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে ওটিটি প্ল্যাটফর্মটিতে বলা হয়েছে, ‘অঞ্জন দত্তের চোখে অজানা মৃণাল সেন। ব্যক্তিগত জীবনী থেকে উদ্ধৃত কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেনের জন্মশতবর্ষে অঞ্জন দত্ত-র শ্রদ্ধাঞ্জলি—চালচিত্র এখন।’

‘চালচিত্র এখন’ নামের সিনেমায় মূলত মৃণাল সেনের ‘চালচিত্র’ ছবিতে অঞ্জনের একসাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাই উঠে এসেছে। ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া ওই ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন অঞ্জন দত্ত। সেই সিনেমায় যুক্ত হওয়া, তার আগে মৃণাল সেনের সঙ্গে পরিচয় এবং পুরো সিনেমাটি করার যে যাত্রা—এসবের সবই দেখানো হয়েছে ‘চালচিত্র এখন’–এ। হ্যাঁ, নামগুলো বদলে গেছে। মৃণাল হয়েছেন কুণাল, অঞ্জন হয়েছেন রঞ্জন। তবে শেষে আবার এসব বদল উল্লেখ করাও হয়েছে। এও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সব ঘটনাই সত্য।

ব্যক্তি মৃণাল সেন ও ব্যক্তি অঞ্জন দত্তকে চেনা যায় ‘চালচিত্র এখন’ দিয়ে। অঞ্জন দত্ত সেখানে চাঁছাছোলা। ব্যক্তি হিসেবে নিজের তখনকার ঘাটতি তিনি চরিত্রের সংলাপের মাধ্যমে স্বীকার করে নিয়েছেন নির্দ্বিধায়। ‘চালচিত্র’ করতে গিয়ে নিজের সাধের নাটকের অকস্মাৎ যবনিকা টানার দুঃখ সেখানে যেমন ঠাঁই পেয়েছে, তেমনি বাদ যায়নি ব্যক্তি অঞ্জনের দলগতভাবে কাজ করতে না পারার ব্যর্থতাও।

চালচিত্রে এখন অঞ্জন। ছবি: এসভিএফপরিচালক মৃণাল সেন অনেকের জীবন বদলে দিয়েছেন—এমন বিবৃতি সরাসরি দিয়েছেন পরিচালক অঞ্জন। নিজের জীবনে তাঁর অবদান বোঝাতেই হয়তো। একেবারে দিকশূন্যপুরের এক বিভ্রান্ত নাবিকের তীরে তরী ভেড়াতে পারার পুরো কৃতিত্বটাই তিনি তুলে দিয়েছেন মৃণাল সেনের হাতে। তাতে কোনো ভেক নেই। যেটা নিজে বিশ্বাস করেন, সেটি যেন দর্শকদেরও বোঝাতে চাইলেন অঞ্জন।

শুটিংয়ের প্রস্তুতিতে দুই মৃণাল। ছবি: এসভিএফতরুণ অঞ্জনের ভূমিকায় ছিলেন শাওন চক্রবর্তী। খুবই স্বাভাবিক অভিনয় ক্ষমতা তাঁর। পুরো ছবিতে কখনও মনে হয়নি তিনি অভিনয়ের চেষ্টা করেছেন। বরং তরুণ অঞ্জনের ‘অস্থিরতা’কে পর্দায় দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। তাঁর বিপরীতে পর্দায় মৃণাল সেনকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন খোদ অঞ্জন দত্তই। এবং স্বীকার করতেই হবে, এ ছবিতে অঞ্জনের অভিনয় একেবারেই আলাদা, খুব নজরকাড়া। ঠিক যেমন ঝলক ১৯৮১ সালের ‘চালচিত্র’তে দেখা গিয়েছিল প্রথমবারের মতো। এর বাইরে মৃণাল সেনের স্ত্রীর ভূমিকায় বিদীপ্তা চক্রবর্তী ছিলেন দারুণ। কমতির লেশমাত্র ছিল না তাঁর অভিনয়ে।

‘চালচিত্র এখন’ আসলে মৃণাল সেনকে স্মরণ। জীবন তো কিছু স্মৃতিরই সমষ্টি। মানুষ আসলে জীবনের নামে কেবলই স্মৃতি জমায়। অনেকগুলো স্মৃতিই আদতে মানুষের জীবন। যার সঙ্গে আমাদের সময় কাটানোর স্মৃতি আছে, তাদের নিয়েই আমাদের জীবন চলে। তাদের সঙ্গে কাটানো সময়কেই আমরা আবার স্মরণ করি। অঞ্জন দত্তও ঠিক সেটিই করেছেন ‘চালচিত্র এখন’ ছবিতে। তিনি মৃণাল সেনকে স্মরণ করেছেন, তাঁর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোকে পুণর্নির্মাণ করেছেন। আর এর মধ্য দিয়ে দর্শক হিসেবে আমরা দেখতে পেয়েছি এক অবিস্মরণীয় যাত্রা। আরেকজনের সংস্পর্শে এসে একজন মানুষের কাছে একটি পুরো শহরের আপন হয়ে ওঠার গল্প ‘চালচিত্র এখন’।

অঞ্জন দত্ত। ছবি: এসভিএফসবশেষে বলতেই হয় যে, এই ছবিটি অঞ্জন দত্তের দেওয়া গুরুদক্ষিণা। গুরু সেই হয়, যে কাছের হয়, যার কাছে জীবনের না বোঝা দর্শনকে বোঝা হয়। অমিল তো থাকেই কিছু, তবে তা দেয়াল হয়ে কখনো দাঁড়ায় না। বরং সে হয়ে ওঠে জীবনের ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’। অঞ্জন দত্তের জীবনে মৃণাল সেনের ভূমিকা যে তেমনটাই ছিল, তা ‘চালচিত্র এখন’ ছবির একটি দৃশ্যেই প্রমাণ হয়ে যায়। জীবনে চলার পথে পোড় খাওয়া ‘কুণাল’ একেবারে দিকভ্রান্ত তরুণ ‘রঞ্জন’কে দুপুরে খেয়ে যেতে বলেন, আর জবাবে বার বার না বলতে থাকা রঞ্জন জানায়, বাড়িতে তার অপেক্ষায় কারও ক্ষণগোনার কথা। ঠিক সেই সময়টায় শান্ত স্বরে কুণাল জিজ্ঞেস করেন, ‘সত্যি?’ এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না রঞ্জন, কুণালও আর কিছু জিজ্ঞেস করেন না। শুধু বলেন, ‘দুপুরে খেয়ে যেও।’ এটুকুতেই বোঝা হয়ে যায় আসলে অঞ্জনের জীবনে মৃণাল ছিলেন কতটা!

পরিচালক অঞ্জন দত্তের বেশ কিছু ছবি আছে। ‘রঞ্জনা, আমি আর আসব না’ ছবির জন্য তিনি ভারতের জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। এর বাইরে ‘ম্যাডলি বাঙালি’, ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’ বা ব্যোমকেশ ফ্র্যাঞ্চাইজির সিনেমাগুলোও অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। কিন্তু কেন জানি ‘চালচিত্র এখন’কে এই সবের তুলনায় খুব পরিপক্ক লেগেছে। দেখার অনুভূতিটা বেশ স্নিগ্ধ। হয়তো মৃণাল সেনের প্রতি অঞ্জনের মায়াবোধের অনেকটাই পর্দায় ফুটে উঠেছে বলে। সেদিক থেকে বলতে গেলে, ‘চালচিত্র এখন’ পরিচালক অঞ্জন দত্তের অন্যতম সেরা কাজ। আবার অঞ্জনের অভিনয়ের দিক থেকেও এই ছবিটিকে রাখতে হবে সেরার তালিকায় ওপরের দিকেই। নিজের সর্বোচ্চটাই যে এই ছবিতে নিংড়ে দিয়েছেন তিনি!

রেটিং: ৪.৪/৫.০০  

পরিচালক: অঞ্জন দত্ত
গল্প ও চিত্রনাট্য: অঞ্জন দত্ত
অভিনয়শিল্পী: অঞ্জন দত্ত,  শাওন চক্রবর্তী, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, সুপ্রভাত দাস, শুভাশিষ মুখার্জী, মেঘলা দাশগুপ্ত প্রমুখ 
ভাষা: বাংলা
ধরন: ড্রামা
দৈর্ঘ্য: ৯০ মিনিট
মুক্তি: ১০ মে, ২০২৪/হইচই


লেখক: চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক