সিরিয়াস গায়ক হতে পারেননি, হলেন সিরিয়াল কিলার!

আকা ওয়েব সিরিজের লুকে আফরান নিশো। ছবি: হইচই

‘দানবের দাসত্ব মানব/কোমল হৃদয় কেউ না যেন/আমিও নিলাম বেছে রক্তের পথ/আমাকে নেবে না কেন?’—কথাগুলো ওয়েব সিরিজ ‘আকা’র শিরোনাম সংগীতের। যেখানে ফুটে উঠে সিরিজটির মুখ্য চরিত্র আবুল কালাম আজাদের জীবনকথা। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো। 

ছোটবেলা থেকেই ভীষণ সংগীত অনুরাগী আজাদ। বড় গায়ক হওয়ার স্বপ্ন তার। ক্লাব-রেস্তোরাঁয়—এমন নানা আয়োজনে গান করেন। গানের জন্য তার ডেডিকেশনও মারাত্মক। কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। মাঝেমধ্যেই তার ভাগ্যে জুটে তীব্র বঞ্চনা আর অপমান। একবার তো এক প্রতিযোগিতায় অডিশন দিতে গিয়ে বিচারকদের সঙ্গেই লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যায়! 

অন্যদিকে, জীবনের তাগিদে আজাদ একটি কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানির ডেলিভারিম্যান হিসেবেও চাকরি করেন। সেখানেও পারফরম্যান্স খুব একটা ভালো নয়। বলা যায়, দুনিয়া তার সঙ্গে নেই! যেখানে যান, সেখানেই যেন অঘটন আর ব্যর্থতা তাকে আঁকড়ে ধরে। তার শৈশব আরও অন্ধকারাচ্ছন্ন। দুঃস্বপ্নের মতো একমহূর্তে মা-বাবা-ভাই-বোনের করুণ মৃত্যু দেখেছে। সেই ঘটনায় দৈবক্রমে বেঁচে আছে আজাদ। প্রতিনিয়ত সেই ট্রমাও তাকে তাড়া করে। বাবা-মা’হারা আজাদ তার চাচার কাছে বেড়ে উঠে।

কুরিয়ার সার্ভিস কোম্পানিতে কর্মরত আজাদের ভূমিকায় নিশো। ছবি: হইচই

সিরিয়াস গায়ক হতে চাওয়া সেই আজাদই একসময় সিরিয়াল কিলার আকা রূপে আবির্ভূত হয়। বলতে গেলে, আজাদ ও আকা তখন অভিন্ন সত্তা! আকা এমন এক রহস্যময় চরিত্র, যে কিনা সন্ত্রাস আর অপরাধীর জন্য ত্রাস বা আতঙ্ক, দেশের অনেক মানুষের কাছেই সে জনপ্রিয়—মৃত্যুর অনেক বছর পর সেই আকাই যেন আজাদের মাঝে ফিরে এসেছে। চারদিকে সেই গুঞ্জন। সাইকো সোশ্যাল থ্রিলার গল্পে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হইচই-এর জন্য সিরিজটি পরিচালনা করেছেন ভিকি জাহেদ।

ওয়েব সিরিজটি মূলত প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকদের জন্য। রোমহর্ষক বিভিন্ন দৃশ্য রয়েছে তাতে। পর্দায় আজাদ-আকার গল্পটিও নিপুণভাবে উপস্থাপন করেছেন নির্মাতা ভিকি। যেখানে সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ঘটনার প্রতিচ্ছায়া রয়েছে। মূলত একটা দেশ বা সমাজে যখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি বাসা বাঁধে, সাধারণ মানুষ যখন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত, অপরাধীরা যেখানে পার পেয়ে যায় হরহামেশা—তেমন একটি সময়ে কারও কারও মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। কেননা সমাজে অপরাধীর বিচার নেই। সেই পরিস্থিতিরই যেন এক দৃশ্যকল্প ওয়েব সিরিজ আকা। পর্দায় যেমনটা বলেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়—‘পুরনো দানবকে ধ্বংস করতে কখনও কখনও নতুন দানবের দরকার হয়।’ তবে সিরিজটি এ বিষয়ে একপাক্ষিক নয়; কেউ আকার পক্ষ নেন, আবার কেউ তার সমালোচনা বা বিরোধিতা করেন। অর্থাৎ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া যে অপরাধ—সেই প্রশ্নও হাজির করেছেন নির্মাতা ভিকি।

একটি দৃশ্যে নিশো-নাবিলা। ছবি: হইচই

এদিকে, আজাদ বা আকার ভূমিকায় আফরান নিশোর অভিনয় দুর্দান্ত। অভিনেতা দুটি চরিত্রের মেজাজই গভীরভাবে ধারণ করেছেন। খুনের পর আজাদের অনুশোচনাবোধ দর্শককে কিংবদন্তি ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক ফিওদর দস্তয়ভস্কির বিখ্যাত ‘রাসকলনিকভ’ চরিত্রটির কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসে যেমন এক বুড়িকে খুনের পর গভীর মানসিক পীড়নে ভুগতে থাকে রাসকলনিকভ!  

সিরিজটিতে শুধু খুনোখুনি নয়, গভীর প্রেমেরও উপস্থাপন রয়েছে। আজাদের প্রেমিকা ‘মেঘা’র ভূমিকায় রয়েছেন মাসুমা রহমান নাবিলা। প্রতিটি দৃশ্যে তিনি ছিলেন সাবলীল। তবে এই সিরিজে বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন অভিনেতা আজিজুল হাকিম। আজাদ বা আকার চাচার চরিত্রে মুগ্ধকর অভিনয় করেছেন তিনি। এ ছাড়া ইমতিয়াজ বর্ষণ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শাহেদ আলী, সেমন্তী সৌমি, মুকুল সিরাজ—প্রত্যেকে নিজেদের ভূমিকায় দারুণ ছিলেন।

আজাদের চাচার ভূমিকায় আজিজুল হাকিম। ছবি: হইচই

দৃশ্যধারণে বেশ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন বিদ্রোহী দীপন। নির্মাতা ভিকি ও তাঁর যুগলবন্দিতে কিছু কিছু দৃশ্য ছিল খুবই ম্যাজিক্যাল। আর সেসব দৃশ্যকে দর্শকের মনে গেঁথে দিয়েছে অদীপ সিংয়ের আবহসংগীত। শুধু দৃশ্য কেন, সংলাপেও নিজের জাত চিনিয়েছেন ভিকি। এদিকে, অন্তিম মুহূর্তে রাগিব স্বাগতর কণ্ঠে ‘আমাকে নেবে না কেন’ গানটিও দর্শককে আন্দোলিত করে।

 

রেটিং: ৪.৩০ / ৫.০০
পরিচালক: ভিকি জাহেদ
চিত্রনাট্য ও গল্প: ভিকি জাহেদ 
অভিনয়শিল্পী: আফরান নিশো, মাসুমা রহমান নাবিলা, আজিজুল হাকিম, ইমতিয়াজ বর্ষণ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, শাহেদ আলী, সেমন্তী সৌমি, মুকুল সিরাজ প্রমুখ
ধরন: সাইকো সোশ্যাল থ্রিলার, ক্রাইম
ভাষা: বাংলা
মুক্তি: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ / হইচই