সন্তানের কাছে বাবা-মা পৃথিবীর প্রথম নির্ভরযোগ্য মানুষ। বাবা–মা হিসেবে শিশুর শারীরিক, মানসিক গঠনে লক্ষ্য রাখা এবং তাকে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করার নাম প্যারেন্টিং।
মা সন্তানকে সব থেকে বেশি যত্ন করেন। কাজেই এই সময় শুধু বাবা নয়, পুরো পরিবারের খেয়াল রাখা দরকার মা যেন শান্তিতে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তানের কান্নায় বিরক্ত হয়ে অনেক বাবা আলাদা ঘুমান। এটা করা যাবে না। প্রবোধ কুমার সান্যালের একটি লেখা মনে পড়ল, 'জন্মদাতা হওয়া সহজ, কিন্তু পিতা হওয়া বড় কঠিন।'
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কর্মজীবী মায়ের সন্তানেরা কি তাহলে অযত্নের শিকার? আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা বলে, কর্মজীবী নয় বরং গৃহবধূ মায়ের সন্তানেরা ভোগান্তিতে পড়ে বেশি। কারণ আমাদের সমাজ গৃহবধূর উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে চায়। অথচ মোটেও হিসেব করে না, এই কাজটি যদি একজন পেশাজীবী করতেন, তাহলে তিনি কত টাকা নিতেন? এখন তো গৃহকর্মীরাও এক কাজ–দুই কাজের জন্য আলাদা আলাদা টাকা দাবি করেন।
কাজেই, 'কামাই তো করো না, তাই টাকার মূল্য বোঝো না!' এই কথাটি গৃহবধূকে বলবার আগে আজ থেকে দু'বার ভাবুন। তিনি আছেন বলেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সব দায়িত্বই তাঁর ঘাড়ে চাপানো যাচ্ছে। অথচ তাঁকে ন্যূনতম সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে সমাজ নারাজ। ফলে তিনি বাসায় থাকলেও তেমন বিশ্রামেরও সময় পান না।
গবেষণা বলছে কর্মজীবী মায়ের সন্তানেরা অধিক স্বাবলম্বী হয়। একই সময় বাবা এবং মা কাজ সেরে ফিরলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংসারের বাড়তি দায়িত্ব, ঘরকন্নার কাজ মায়ের উপরে চাপানো হয়। মা কি দশভুজা দুর্গা? তিনি ঘর বাহির দুটোই সামলাচ্ছেন, তারপরও সমাজ তাকে বলছে তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। কাজেই সন্তান যদি ছোটবেলা থেকেই মাকে অসম্মান করতে দেখে, সে কি শিখবে?
আবার অনেক পরিবারেই শেখানো হয়, ছেলের বাড়ির মাথা উঁচু, মেয়ের বাড়ির মাথা নীচু। এই ধরনের পরিবারগুলোও শিশুকে মর্যাদাবোধ শেখাতে পারে না। মাকে সম্মান করতে না শেখালে শিশুর মধ্যেও ব্যক্তিত্বের ঘাটতি তৈরি হবে। নেপোলিয়ন তো সাধে বলেন নি, 'If you give me a good mother I will give you a good Nation!' কিন্তু গুড মাদারকে আমরা কখনো রান্নাঘরে আবদ্ধ থাকেন বলে অসম্মান করব, আবার কখনো চাকরি করছেন বলে অসম্মান করব তা তো হয় না।
বিভিন্ন বয়সের শিশুদের চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন থাকে। যেমন: জন্মের প্রথম ছয় মাস শিশুর যত্ন প্রয়োজন হয় অস্তিত্ব রক্ষায়। এই সময় যদি ঠিকঠাক যত্ন করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এসব শিশুর মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা দেখা যায়।
৬ থেকে ১৮ মাস বয়সের শিশুদের যদি ঠিকভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে সেসব শিশুদের কর্মতৎপরতার জায়গাটা চমৎকার থাকবে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে সে যখন প্রাপ্তবয়স্ক হবে, তখন তার সম্পর্কগুলোকে সে নিরাপদ ভাববে।
শিশুর বয়স যখন ৬ থেকে ধীরে ধীরে ১৮ মাস হয়, এ সময়ের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়ন মাকে অস্থির করে তুললে সে শিশু ভবিষ্যতে আন্তঃসম্পর্কে অনিরাপদ এবং দুশ্চিন্তায় পড়বে। এদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেকে নার্ভাস এবং অনিরাপদ ভাববে, কেউ কেউ এমন খোলসের ভেতর ঢুকে যাবে সে খোলসের মধ্যে আর কেউ ঢুকতেই পারে না, আবার কেউ খুব প্রচণ্ডভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়বে। এ সময় ভালোবাসার মানুষ হাত বাড়ালেও সেই হাত ধরা হয়না। কাজেই সন্তানের স্বার্থেই মাকে ভালো রাখুন।
শিশুদের বয়স যখন ১৮ মাস থেকে ৩ বছর হয়, তখন তার মধ্যে চিন্তা করার শক্তি তৈরি হয়। এই সময়ে শিশুর মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে শিশু ভবিষ্যতে নতুন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধায় পড়বে।
৩ থেকে ৬ বছর শিশুর নিজস্ব বোধ তৈরি হওয়ার সময়। ৬ থেকে ১২ বছর হল শিশুর স্কিল বা কার্যক্ষমতা তৈরির সময়। পরবর্তী ১২ থেকে ১৯ বছর হল শৈশবে সে যা শিখেছে সেটাকে বিনিসুতার মালা সমন্বয় করে আত্মস্থ করার এবং সামাজিক দক্ষতা বিনির্মাণের সময়।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ