খেতে বসে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের মধ্যে, কিংবা ঘুমাতে যাওয়ার সময় হেঁচকি শুরু হওয়াটা খুব সাধারণ একটি বিষয়। তবে একটানা হেঁচকি ওঠাটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক। মিনিটে ৪ থেকে ৬০ বার হেঁচকির প্রকোপ দেখা দিতে পারে, যা থাকতে পারে কয়েক মিনিট থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত!
লাগাতার হেঁচকি উঠলে খাওয়া, ঘুম, সামাজিকীকরণের মতো দৈনন্দিন কাজগুলোতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে এটি মারাত্মক অসুখের ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই বারবার হেঁচকি উঠলে একেবারেই অগ্রাহ্য করবেন না।
কেন ওঠে হেঁচকি
ডায়াফ্রামে অস্বস্তি হলেই মূলত হেঁচকি ওঠে আমাদের। ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদা হলো একধরনের পেশীবহুল পর্দা যা বক্ষগহ্বরকে উদয়গহ্বর থেকে আলাদা করে। উল্টানো বাটির মতো দেখতে এই পর্দাটি আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ডায়াফ্রামের হঠাৎ সংকোচনের ফলেই হেঁচকি তৈরি হয়।
প্রতিবার ডায়াফ্রাম সংকোচনের সময় ভোকাল কর্ড বন্ধ হয়ে যায়। তখন 'হিক' করে শব্দ হয়।
কিন্তু এই ডায়াফ্রামের সংকোচন বা অস্বস্তির পেছনে কী কারণ রয়েছে, এমন প্রশ্ন জাগাটা খুব স্বাভাবিক। আসলে বিশেষজ্ঞরা এখনও এর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে চলেছেন।
তবে তাঁরা এর সম্ভাব্য কিছু কারণ বের করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে-
দ্রুত খাওয়া
দ্রুত খাওয়া বা পানি পানের কারণে খাবারের সাথে সাথে পেটের ভেতর বাতাস প্রবেশ করতে পারে। এতে ব্লটিং দেখা দিতে পারে; পেটে গ্যাস জমে গেলে বা পেট ফুলে গেলে তাকে ব্লটিং বলে। এতে হেঁচকি তৈরি হয়।
মশলাদার খাবার
অতিরিক্ত ঝাল বা মশলাদার খাবার গ্রহণে ডায়াফ্রামে অস্বস্তি সৃষ্টি হতে পারে। যেমন কেউ যদি একসাথে অনেকগুলো কাঁচামরিচ খেয়ে ফেলেন, তাহলে হেঁচকি উঠতে পারে। আবার অ্যালকোহল পান থেকেও এমন সমস্যা হতে পারে।
পাকস্থলীতে বেশি বাতাস থাকলে
পাকস্থলীতে বাতাস থাকলে, বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে, কার্বোনেটেড ওয়াটার পান করলে, চুইংগাম চিবোলে হেঁচকি উঠতে পারে।
সাধারণত মিনিটখানেকের মধ্যেই হেঁচকি স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এই ধরণের হেঁচকি সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা থাকতে পারে, এরপর নিজেই ঠিক হয়ে যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যাকিউট হেঁচকি বলা হয়।
প্রতিরোধ
ঘরোয়াভাবে হেঁচকি থামানোর কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে-
১০-২০ সেকেন্ডের জন্য দম বন্ধ করে রাখলে বা কাগজের ব্যাগে নিশ্বাস ফেললে সুফল মিলতে পারে। হেঁচকি উঠলে দুই হাঁটু বুক পর্যন্ত টেনে ধরে সামনের দিকে ঝুঁকলে ডায়াফ্রামের ওপর চাপ পড়ে। এতে হেঁচকি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
ঠাণ্ডা পানি দিয়ে কুলকুচি করলে বা একটু একটু করে বরফ ঠাণ্ডা পানিতে চুমুক দিলে ভ্যাগাস স্নায়ুর মধ্যে উদ্দীপনা (স্টিমুলেশন) সৃষ্টি সম্ভব। ভ্যাগাস স্নায়ুটির সংযোগ ডায়াফ্রামের সঙ্গে রয়েছে, ফলে এই স্নায়ু ডায়াফ্রামকে রিল্যাক্স করতে পারে।
শরীরের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে প্রেশার বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেও ডায়াফ্রামের ভ্যাগাস স্নায়ুকে স্টিমুলেট করা সম্ভব। আবার লেবুতে কামড় দিলে বা জিভে কয়েক ফোঁটা ভিনেগার রাখা হলেও ডায়াফ্রামকে রিসেট করা সম্ভব, এতেও হেঁচকি বন্ধ হবে
চিকিৎসকের পরামর্শ
অনেক সময় অন্য কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ক্রনিক হেঁচকি দেখা দিতে পারে। যদি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হেঁচকি থেমে না যায়, কিংবা ঘুম-খাওয়াদাওয়ার মতো দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: ইউসিএলএ হেলথ