বায়ুদূষণ কীভাবে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে?

বেশ কয়েক বছর থেকে দেশে বাড়ছে বায়ুদূষণ। শীতের মত শুকনো মৌসুমে যা সর্বোচ্চমাত্রায় পৌঁছে। দেশের মানুষের গড়আয়ু বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে- বায়ুদূষণ মারাত্মক এক স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বায়ুদূষণের কারণ কী?

বায়ুদূষণের প্রধান তিনটি উৎসের মধ্যে প্রথম হচ্ছে- যানবাহনের ধোঁয়া, বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের ধোঁয়া, যা বেশ মারাত্মক। এরপরই রয়েছে শুষ্ক মৌসুমে নির্মাণকাজের কারণে সৃষ্ট ধুলা। তৃতীয় স্থানে আছে ইটভাটার ধোঁয়া। এছাড়া, শহরের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থেকে ক্ষতিকর মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। প্রায়ই এসব আবর্জনার স্তূপ পুড়িয়ে ফেলতে দেখা যায়। এসব আবর্জনা পোড়ানো ধোঁয়া ফের বায়ুদূষণের সূত্রপাত ঘটায়।

বায়ুদূষণ বোঝার উপায় কী?

সাধারণত ধুলাবালি, ধোঁয়া, দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস যে দূষিত, সেটা সাধারণ ভাবেই বোঝা যায়। তবে, বাতাসের গুণমানের সূচককে একিউআই বলা হয়, যা প্রতিদিনের বাতাসের অবস্থা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। এবং এটি নির্দেশ করে- চারপাশের বায়ু কতটা নির্মল বা কতটা দূষিত। একিউআই সূচকে বায়ুর মান, শূন্য থেকে ৫০ থাকলে ওই স্থানের বাতাস স্বাস্থ্যকর। ১০০ থেকে ১৫০ এর মধ্যে থাকলে প্রত্যেকের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউ এয়ার’ দূষিত বাতাসের শহরের তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকায়, গত ৩ বছরে বিভিন্ন সময় পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের দিক থেকে শীর্ষ অবস্থানে ছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।

বায়ুদূষণ কি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে?

বাতাসে বিভিন্ন ধরনের ধূলিকণা থাকে। এসবের পরিমাণ যখন বেড়ে যায় তখন বায়ুদূষণ হয়। কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনো-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, বিভিন্ন যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এসব বিষাক্ত এবং ক্ষতিকর পদার্থ শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে মাধ্যমে ফুসফুসে যাচ্ছে। এতে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার, ফুসফুস থেকে এসব কেমিক্যাল রক্তে মিশে যাচ্ছে। মূলত বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম-২.৫ এর পরিমাপ করে বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়। পিএম-২.৫ কণা পিএম ১০ কণার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক, কারণে এটি দীর্ঘ সময় (দিন বা সপ্তাহ) বাতাসে থাকে এবং বাতাসের মাধ্যমে অনেক দূর ছড়িয়ে যেতে পারে। আর সূক্ষ্ম কণা হওয়ার ফলে ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে এবং দ্রুত ফুসফুস আক্রান্ত করে। দীর্ঘদিন ক্ষতিকর পদার্থ শরীরে প্রবেশের ফলে ফুসফুস, কিডনি, লিভার, হৃৎপিণ্ডে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এক পর্যায়ে দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের অঙ্গ পতঙ্গ বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে।

বায়ুদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি কী কী?

পিওর আর্থের মতে, বিশ্বব্যাপী অসংক্রামক রোগের প্রধান কারণ দূষণ। কার্ডিওভাসকুলার রোগের ২২ ভাগ, স্ট্রোকের ২৫ ভাগ, ফুসফুস ক্যানসারের ৪০ ভাগ ও ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পুলমানারি ডিজিজ-এর (COPD) ৫৩ ভাগ মৃত্যুর জন্য দায়ী বিষাক্ত দূষণ। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, বায়ুদূষণে প্রতি বছর ৭০ লাখ মানুষ অকালে মারা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশিদের গড় আয়ু কমেছে ৭ বছর। আর রাজধানীবাসীর কমেছে ৮ বছর, যা এর ভয়াবহতার মাত্রাকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে।

বায়ুদূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি বিজ্ঞানীদের। দীর্ঘস্থায়ী বায়ুদূষণের কারণে- ফুসফুসের নানা রোগ, বিশেষ করে- অ্যাজমা, COPD, ফুসফুসের ক্যানসার, লিউকেমিয়া, অটিজম, স্নায়ুজনিত সমস্যা বেড়ে যাওয়া, কিডনির সমস্যা, প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি, উচ্চরক্তচাপ দেখা দিতে পারে। শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশে চলতে থাকা বায়ুদূষণ প্রভাব ফেলে মানসিকতায়। বায়ুমণ্ডলে এ বায়ুদূষণের ক্রমবর্ধমান বিষাক্ত গ্যাসের কারণে অবসাদ ও মানসিক উদ্বেগ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা।

বায়ুদূষণ কমানোর উপায়

সিএনজিচালিত যানবাহন-এ কালো ধোঁয়া তুলনামূলক কম হয়, তাই দূষণও কম। তাই সিএনজিচালিত যানবাহন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিযুক্ত যানবাহন রাস্তায় না চলতে দেওয়ার ব্যাপারে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যেতে পারে। কল-কারখানার ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ধোঁয়া নির্গমন নল ও চিমনিতে ছাকনি বা অন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।

বায়ুস্তর সংরক্ষণে প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিমাণ হ্রাস করে সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস ইত্যাদির ব্যবহার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। বিভিন্ন পরিত্যক্ত বর্জ্য না পুড়িয়ে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা যায়। কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প উপায়ে শস্যের রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি হাটবাজার, বসতবাড়ি থেকে পচনশীল দ্রব্য দ্রুত অপসারণ করতে হবে। শহরাঞ্চলে বিভিন্ন স্থানে রাখা ডাস্টবিনের ময়লা দ্রুত শোধনাগারে পাঠাতে হবে।

প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বায়ু বা বাতাস। প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে যা আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক। তাই বায়ু দূষিত হলে, অন্যান্য যেকোনো দূষণের চেয়ে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে খুব সহজেই। আমরা যেন এই দিকটা চিন্তা করে, বায়ুকে নির্মল রাখতে সচেষ্ট হই।

লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ