হিউম্যান মেটা নিউমো ভাইরাস (এইচএমপিভি) সকল বয়সের মানুষের মধ্যে বিশেষ করে ছোট শিশু, বয়স্কদের এবং দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের মানুষদের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ তৈরি করে। এইচএমপিভি মানবদেহে প্রথম শনাক্ত করা হয় ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডে।
বেশিরভাগ শিশু ৫ বছর বয়সের মধ্যেই কোনো না কোনো এক সময় এই রোগে আক্রান্ত হয়। ৫ বছর বয়সের পরে প্রায় শিশুর শরীরে এই ভাইরাসের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়। ৫ বছরের কম বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস সংক্রমণ হলে তাদের নিউমোনিয়া হতে পারে। সিডিসি’র মতে প্রতি বছর বিশ্বে ৫ বছরের কম বয়সের শিশুদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয় এইচএমপিভি সংক্রমণজনিত জটিলতার কারণে।
পাব মেড সেন্ট্রাল জার্নালের মে ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, এইচএমপিভি দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শতকরা ৩ দশমিক ২ শতাংশ রোগী পরবর্তীতে নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয় কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস বা ফ্লুতে আক্রান্তদের মধ্যে শতকরা ৭ ভাগ রোগী পরবর্তীতে নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়। তাই এইচএমপিভি সংক্রমণের কারণে জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণ ফ্লু’র চাইতেও কম।
সিডিসি-এর ন্যাশনাল রেসপিরেটরি অ্যান্ড এন্টারিক ভাইরাস সার্ভিল্যান্স সিস্টেম (NREVSS) থেকে জানা যায়, শীতের শেষের দিকে এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে বসন্তকালে এইচএমপিভি সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাস শীত ঋতুতে এইচএমপিভি, আর এস ভি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস একই সঙ্গে সঞ্চালিত হতে পারে।
এইচএমপিভি লক্ষণ
সাধারণত এইচএমপিভি–এর সঙ্গে যুক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে কাশি, জ্বর, নাক বন্ধ হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট। এইচএমপিভি সংক্রমণের ব্রংকাইটিস বা নিউমোনিয়াতে অগ্রসর হতে পারে এবং অন্যান্য ভাইরাসগুলির মতো শ্বাসতন্ত্রের উপরের এবং নীচের অংশে সংক্রমণ ঘটায়। বিভিন্ন মাধ্যমে এইচএমপিভি সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যেমন:
- কাশি এবং হাঁচি থেকে নিঃসরণে।
- ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত যোগাযোগ, যেমন স্পর্শ করা।
এইচএমপিভি প্রতিরোধ
নিম্নের পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করে এইচএমপিভি এবং শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে সাহায্য করতে পারে:
- কমপক্ষে ২০ সেকেন্ডের জন্য সাবান এবং পানি দিয়ে প্রায়শই হাত ধুয়ে নিতে হবে।
- না ধোয়া হাতে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করা এড়িয়ে চলতে হবে।
- যারা অসুস্থ তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে হবে।
- যাদের সর্দি-কাশির উপসর্গ থাকে তাদের উচিত, কাশি এবং হাঁচির সময় তাদের মুখ এবং নাক ঢেকে রাখতে হবে।
- অন্যদের সঙ্গে আক্রান্তদের থালাবাসন, কাপ এবং খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
- অন্যকে চুম্বন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এছাড়া সম্ভাব্য দূষিত স্থান (যেমন দরজার হাতল এবং খেলনা) পরিষ্কার করার মাধ্যমে এইচএমপিভি এর বিস্তার বন্ধ করতে সাহায্য করতে পারে।
পরীক্ষা এবং রোগ নির্ণয়
যেহেতু এইচএমপিভি একটি শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস তাই যারা স্বাস্থ্যসেবা দিবেন, তারা নিয়মিতভাবে এইচএমপিভি -এর জন্য বিবেচনা বা পরীক্ষা নাও করতে পারেন। তাই স্বাস্থ্যসেবায় যারা থাকেন, তাদের শীত ও বসন্তের সময় এইচএমপিভি পরীক্ষা বিবেচনা করা উচিত। বিশেষ করে যখন এইচএমপিভি সাধারণভাবে সঞ্চালিত হয়। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা যায়। যেমন:
- এইচএমপিভি সংক্রমণ সাধারণত ‘আরটি পিসিআর’ পরীক্ষার দ্বারা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
- নিউক্লিক অ্যাসিড অ্যামপ্লিফিকেশন টেস্ট (NAAT) দ্বারা ভাইরাল জিনোমের সরাসরি শনাক্তকরণ করা যেতে পারে।
- ইমিউনোফ্লোরোসেন্স বা এনজাইম ইমিউনোসে ব্যবহার করে শ্বাসতন্ত্রের নিঃসরণে ভাইরাল অ্যান্টিজেনগুলির সরাসরি শনাক্তকরণ করা যেতে পারে।
চিকিৎসা
বর্তমানে এইচএমপিভি-এর চিকিৎসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল থেরাপি নেই। এবং এইচএমপিভি প্রতিরোধ করার জন্য কোনো ভ্যাকসিন নেই। তাই রোগের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।
করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে চীনের উত্তর অঞ্চলে এইচএমপিভি ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয়। এতে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ ২০১৯ সালে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বব্যাপী ৭০ লাখ মানুষ মারা যায়। করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঠিক পাঁচ বছর পর এইচএমপিভি ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
২০১৪-২০১৬ সালে আরেকটি গবেষণায় ঢাকায় এই ভাইরাস শনাক্ত হয়। আমাদের ধারণা প্রতি বছরই শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসটির ভূমিকা রয়েছে। এই দেশে এইচএমপিভি ভাইরাস একটি সাধারণ নৈমিত্তিক রোগ। এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর ন্যূনতম কোনো কারণ নেই। তবে সংক্রমণ যেন ব্যাপক হারে বাড়তে না পারে, সেজন্য সচেতন থাকতে হবে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম