জন্মগত হৃদ্রোগ হল এমন এক ধরনের হৃদ্রোগ, যা শিশুর জন্মের সময় থেকেই বিদ্যমান থাকে। এটি হৃৎপিণ্ডের গঠনগত সমস্যা, যা রক্তপ্রবাহের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে।
গুরুতর জন্মগত হৃদ্রোগ সাধারণত জন্মের পরপরই বা জীবনের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই ধরা পড়ে। লক্ষণগুলো হতে পারে:
১. ঠোঁট, জিহ্বা ও নখের রং ফ্যাকাশে বা নীলচে হয়ে যাওয়া।
২. দ্রুত শ্বাস নেওয়া।
৩. চোখ, পা কিংবা পেট ফুলে যাওয়া।
৪. খাওয়ার সময় শ্বাসকষ্ট।
৫. ওজন বৃদ্ধি না পাওয়া।
কম গুরুতর জন্মগত হৃদ্রোগ শিশুদের মধ্যে পরে প্রকাশ পেতে পারে, যার লক্ষণ হতে পারে:
১. সামান্য পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট।
২. খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়া।
৩. ব্যায়াম বা কার্যকলাপে জ্ঞান হারানো।
৪. হাত, পা বা গোড়ালিতে ফোলাভাব।
জন্মগত হৃদরোগের কারণ
শিশুর হৃৎপিণ্ড সাধারণত গর্ভাবস্থার প্রথম ছয় সপ্তাহের মধ্যে গঠিত হয়। এই সময়ে যদি কোনো অস্বাভাবিকতা ঘটে, তাহলে জন্মগত হৃদরোগের সৃষ্টি হতে পারে। কিছু কারণ হতে পারে:
জেনেটিক সমস্যা: পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেশি থাকে।
গর্ভকালীন সংক্রমণ: গর্ভাবস্থায় রুবেলা (জার্মান হাম) হলে শিশুর হৃদরোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
ডায়াবেটিস: গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলে শিশুর হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে।
ওষুধ ও রাসায়নিক পদার্থ: কিছু ওষুধ, যেমন লিথিয়াম বা আইসোট্রেটিনোইন (ব্রণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত) হৃদরোগের কারণ হতে পারে।
অ্যালকোহল ও ধূমপান: গর্ভাবস্থায় মদ্যপান ও ধূমপান করলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সাধারণ জন্মগত হৃদরোগের ধরণ
অ্যাট্রিয়াল সেপ্টাল ডিফেক্ট (ASD): হৃদপিণ্ডের উপরের দুই কক্ষের মধ্যে ছিদ্র।
ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট (VSD): নিচের দুই কক্ষের মধ্যে ছিদ্র।
পেটেন্ট ডাকটাস আর্টেরিওসাস (PDA): ফুসফুসের ধমনি ও মহাধমনী মধ্যে সংযোগ রয়ে যাওয়া।
টেট্রালজি অব ফ্যালট (TOF): হৃদ্যন্ত্রের চারটি প্রধান ত্রুটির সমন্বয়ে গঠিত।
ট্রান্সপজিশন অব দ্য গ্রেট আর্টারিজ (TGA): প্রধান ধমনীগুলোর অস্বাভাবিক অবস্থান।
জটিলতা
১. হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা হ্রাস
২. হৃদ্যন্ত্রের সংক্রমণ
৩. অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন
৪. বিকাশগত সমস্যা
৫. স্ট্রোক
প্রতিরোধ ও করণীয়
গর্ভকালীন চেকআপ: গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ: গর্ভধারণের আগে ও পরে ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ।
ধূমপান বন্ধ: ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা।
রুবেলা টিকা গ্রহণ: গর্ভধারণের আগে রুবেলা ভ্যাকসিন নেওয়া।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখা।
জন্মগত হৃদরোগের দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ ও সচেতনতা শিশুর সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে পারে। শিশুর যদি কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
লেখক: মিনিম্যালী ইনভেসিভ কার্ডিয়াক অ্যান্ড এওর্টিক সার্জন, জাতীয় হৃদ্রোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল