রিউমাটিক হার্ট ডিজিজ একটি জটিল হৃদ্রোগ, যা মূলত রিউমাটিক জ্বরের কারণে সৃষ্ট হয়। এটি সাধারণত অনিয়ন্ত্রিত বা চিকিৎসাহীন স্ট্রেপটোকক্কাল সংক্রমণের (যেমন: স্ট্রেপ থ্রোট বা স্কারলেট জ্বর) ফলে দেখা দেয়। এই সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে হৃদ্যন্ত্রের ভালভকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
রিউমাটিক হার্ট ডিজিজের কারণ
রিউমাটিক হার্ট ডিজিজের মূল কারণ হলো রিউমাটিক জ্বর। এটি শরীরের বিভিন্ন সংযোগকারী টিস্যু, বিশেষ করে হৃৎপিণ্ড, সন্ধি, ত্বক এবং মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই জ্বর হৃদ্যন্ত্রের ভালভকে সংকুচিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যার ফলে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়।
কারা ঝুঁকির মধ্যে আছেন?
যেসব শিশু বা কিশোর বারবার স্ট্রেপ ইনফেকশনে আক্রান্ত হয়, তাদের মধ্যে রিউমাটিক জ্বর ও পরবর্তী সময়ে রিউমাটিক হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি বেশি। সাধারণত ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।
১. উচ্চমাত্রার জ্বর।
২. সন্ধিগুলোর ব্যথা ও ফোলা (বিশেষত হাঁটু ও গোড়ালিতে)।
৩. ত্বকের নিচে ছোট ছোট গুটি (নডিউল)।
৪. বুকে, পিঠে বা পেটে লালচে ফুসকুড়ি।
৫. শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা।
৬. হাত-পা বা মুখের অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া।
৭. শারীরিক দুর্বলতা।
হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতির লক্ষণ
১. শ্বাসকষ্ট (বিশেষ করে হাঁটার সময় বা শোওয়ার সময়)।
২. বুক ব্যথা।
৩. হাত-পা ফুলে যাওয়া।
রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা
রিউমাটিক হার্ট ডিজিজ নির্ণয়ের জন্য বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করা হয়। এগুলো হলো:
- গলার নমুনা পরীক্ষা বা রক্ত পরীক্ষা: স্ট্রেপ সংক্রমণ চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়।
- ইকোকার্ডিওগ্রাম (ইকো): হৃদ্যন্ত্রের ভালভের অবস্থা ও রক্ত প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
- ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি): হৃদ্যন্ত্রের বিদ্যুৎ সংকেত পরীক্ষা করা হয়।
- এক্স-রে: হৃদ্যন্ত্রের আকার ও ফুসফুসের অবস্থা নির্ণয়ে সাহায্য করে।
- কার্ডিয়াক এমআরআই: আরও বিস্তারিত চিত্র পেতে ব্যবহৃত হয়।
রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
রিউমাটিক হার্ট ডিজিজ প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হলো স্ট্রেপ ইনফেকশন দ্রুত নিরাময় করা। রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসার মূল ধাপগুলো হলো:
- অ্যান্টিবায়োটিক: স্ট্রেপ ইনফেকশন প্রতিরোধ ও রিউমাটিক জ্বরের পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবহৃত হয়।
- প্রদাহ কমানোর ওষুধ: অ্যাসপিরিন, স্টেরয়েড বা এনএসএআইডি ব্যবহৃত হতে পারে।
- হার্ট ফেইলিওর ব্যবস্থাপনা: হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়।
- সার্জারি: যদি ভালভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে ভালভ প্রতিস্থাপন বা মেরামত করা হতে পারে।
সম্ভাব্য জটিলতা
রিউমাটিক হার্ট ডিজিজ থেকে কিছু মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। সেগুলো হলো:
- হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া।
- ব্যাকটেরিয়াল এন্ডোকার্ডাইটিস (হৃদ্যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ প্রদাহ)।
- গর্ভাবস্থায় জটিলতা।
- ভালভ ফেটে যাওয়া, যা জরুরি অস্ত্রোপচার ছাড়া নিরাময় সম্ভব নয়।
জীবনধারা ও রোগ ব্যবস্থাপনা
রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং হৃদ্যন্ত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা।
- দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে পুনরায় সংক্রমণ প্রতিরোধ করা।
- হৃদ্যন্ত্রের অতিরিক্ত চাপ এড়ানোর জন্য শারীরিক কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা বজায় রাখা।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
যদি রোগীর শ্বাসকষ্ট, বুকের ব্যথা বা শরীর ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রিউমাটিক হার্ট ডিজিজ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনও একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এটি প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হলো স্ট্রেপ সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই রোগজনিত জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
লেখক: মিনিম্যালি ইনভেসিভ কার্ডিয়াক অ্যান্ড এওর্টিক সার্জন, জাতীয় হৃদ্রোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল।