অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়াতে শরীরের রক্তকোষ কেন কমে যায়?

অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া এক ধরনের রক্তের রোগ। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হলে মানুষের ইমিউন সিস্টেম অস্থিমজ্জার স্টেম কোষকে আক্রমণ করে। এতে অস্থিমজ্জার কোষগুলি যথেষ্ট পরিমাণে নতুন রক্তকোষ (লোহিত, শ্বেত রক্ত কণিকা ও অণুচক্রিকা) উৎপাদন করতে পারে না।

আমাদের শরীরে তিন ধরনের রক্তকণিকা আছে। ১. লোহিত রক্তকণিকা, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে। ২. শ্বেত রক্তকণিকা, যা যে কোনো রোগ বা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ৩. অণুচক্রিকা, যা রক্ত জমাট বাঁধার কাজ করে। রক্তের কোষগুলি অস্থিমজ্জাতে তৈরি হয়। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া রোগে অস্থিমজ্জার কোষগুলি যথেষ্ট পরিমাণে নতুন উৎপাদন করে না, ফলে রক্তে এই কোষগুলির স্বল্পতা দেখা যায়।

অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া রোগের লক্ষণগুলো হলো: ১. ক্লান্তি, অবসাদগ্রস্ততা ২. বুক ধড়ফড় করা ৩. চোখে ঝাপসা দেখা ৪. মাথা ঘোরা, মাথা ধরা ৫. ক্ষুধামন্দা, ৬. চোখ, হাত-পা, ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশে বিপজ্জনকভাবে বেড়ে চলেছে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতাজনিত বিভিন্ন রোগ। বিশেষ করে বয়স্ক এবং নারীদের মধ্যে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি থাকে। অনেকের ধারণা, অ্যানিমিয়া শুধু পুষ্টির অভাবে হয়। কিন্তু এই ধারণাটি ভুল। আসল বিষয় হলো অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা নানা কারণেই দেখা দিতে পারে। অ্যানিমিয়াকে সাধারণভাবে আমরা দেহে রক্তের অভাব বলে শনাক্ত করে থাকি। কিন্তু অ্যানিমিয়ার বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। এমনই এক প্রকার অ্যানিমিয়ার নাম হল অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া।’

অনেক কারণে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া হতে পারে। ডা এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশক (যেমন- অর্গানো ফসফেট কমপাউন্ড) এর সংস্পর্শে কাজ করা, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ হয় এমন যন্ত্র বা পদার্থের কাছাকাছি অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করা, কেমোথেরাপি ঔষধের মাধ্যমে ক্যানসার চিকিৎসা করানো, অটোইমিউন ডিসঅর্ডার (লুপাস এবং রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগ), ভাইরাল ইনফেকশন (হেপাটাইটিস, এপস্টিন-বার, সাইটোমেগালোভাইরাস, পারভোভাইরাস বি-১৯ এবং এইচআইভি), এবং গর্ভাবস্থা যা কখনও কখনও এই রোগের কারণ হতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন আহমেদ এর মতে, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা বিহীন থাকলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। যেমন রক্তের ক্যানসার, মায়েলোডিসপ্লাসিয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে হিমোগ্লোবিন বের হয়ে যাওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে জীবাণু সংক্রমণের প্রবণতা বৃদ্ধি, কারণ তারা আর শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি করে না, যা জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য দায়ী। তাই অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা ধরা পড়লে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যানিমিয়ার কারণ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসার প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসা সম্পূর্ণরূপে অবস্থার তীব্রতা এবং রোগীর বয়সের উপর নির্ভর করে। এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীকে রক্ত প্রতিস্থাপন করা হয়। অটোইমিউন ডিসঅর্ডারের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকলে ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ঔষধ দেওয়া হয় যাতে রোগীর ইমিউন সিস্টেমকে দমন করা যায়। অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়াতে অস্থি মজ্জা উদ্দীপক ওষুধগুলি শরীরের রক্তকোষের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দেওয়া হয়। অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া নিরাময়ের সর্বোত্তম চিকিৎসা।