দাঁতের চিকিৎসায় অ্যানেসথেসিয়া: প্রয়োজন যেসব সতর্কতা

অ্যানেসথেসিয়া একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে কোনো ব্যক্তি অপারেশনের সময় যন্ত্রণা এড়াতে সমর্থ হন। অ্যানেসথেসিয়া কী, কী কী ধরনের হতে পারে, কী সতর্কতা প্রয়োজন বা কোনো সার্জারিতে এর গুরুত্ব কতটা সেই সম্পর্কে ধারণা নেই অনেকেরই।

অ্যানেসথেসিয়া কী

যখন সার্জারির প্রয়োজনে কোনো রোগীকে ব্যথামুক্ত করা হয়, সেটিই ক্লিনিক্যাল অ্যানেসথেসিয়া। অনেকভাবে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া যায়। যেমন-

১. জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া।

২. রিজিওনাল অ্যানেসথেসিয়া।

৩. লোকাল অ্যানেসথেসিয়া।

৪. মনিটরিং অ্যানেসথেসিয়া।

দাঁতের চিকিৎসায় যে অ্যানেসথেসিয়া বেশি ব্যবহৃত হয় তা হলো লোকাল অ্যানেসথেসিয়া। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া বলতে আমরা বুঝি এমন পদ্ধতি, যেখানে রোগীকে পুরোপুরি অচেতন না করে শুধু নির্দিষ্ট স্থান অবশ করা হয়। যাতে চিকিৎসা চলাকালে কষ্ট বা ব্যথা না হয়।

দাঁতে ব্যথা, দাঁত তোলা, রুট ক্যানেল, ছোট-বড় অস্ত্রোপচার, ইমপ্ল্যান্ট, এমনকি ডিপ ফিলিংয়েও প্রয়োজনে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহৃত হয়। এর ফলে সঠিকভাবে আধুনিক চিকিৎসা করা সম্ভব হয়, অসহনীয় ব্যথায় রোগীকে শান্ত রাখা যায়।

স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা অনুভূতির সঞ্চালন হয় বলেই আমরা ব্যথা পাই। ফাইল ছবিকীভাবে কাজ করে

স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা অনুভূতির সঞ্চালন হয় বলেই আমরা ব্যথা পাই। লোকাল অ্যানেসথেসিয়াটিকসে বিশেষ ধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়, যা স্নায়ুকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত সংকেত পাঠাতে বাধা দেয়। ফলে চিকিৎসা দেওয়ার স্থান অবশ থাকে। তবে ব্যথার অনুভূতি কমে গেলেও এখানে চাপ বা স্পর্শ অনুভূত হয়, যার স্থায়িত্বকাল নির্ধারণ করে প্রয়োগ করা হয় এ ওষুধ।

কীভাবে দেওয়া যায়

সাধারণত ত্বকের ওপর স্প্রে বা জেল ফর্মে লাগানো যায়। শিশুদের নড়ে যাওয়া দুধদাঁত ফেলা, ছোট কোনো গোটা, বায়োপসি বা কোনো ইনজেকশন পুশ করার আগে এটা দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাধ্যমে স্নায়ু অবশ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওপরের দাঁত ও নিচের সামনের দাঁতকে ইনফিলট্রেশনের মাধ্যমে অল্প স্থান অবশ করা হয়ে থাকে। তবে নিচের পেছনের দাঁতগুলোতে বা অপেক্ষাকৃত বড় অস্ত্রোপচারে স্নায়ু ব্লক করতে হয়। তখন অনেকটা জায়গা জুড়ে অবশ হয়। নিচের স্নায়ু ব্লকে রোগীর ঠোঁট ও জিবের অর্ধেকটা পর্যন্ত অবশ হয় এবং ফুলে না গেলেও ফোলা অনুভূতিসহ কিছুটা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে, যা সাধারণত এক থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

কতটুকু নিরাপদ

একজন অভিজ্ঞ ডেন্টিস্ট সতর্কতার সঙ্গে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া দিয়ে থাকেন। তবে হাতুড়ে বা ভুয়া চিকিৎসকের খপ্পরে পড়লে নানা জটিলতাসহ অপূরণীয় ক্ষতির ইতিহাস রয়েছে। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে অহেতুক অতিরিক্ত ভয় বা অন্য কোনো কারণে সাময়িক কিছু সমস্যা হতে পারে, যা ডেন্টিস্ট সহজেই সমাধান করতে পারেন।

দাঁতে ব্যথা, দাঁত তোলা, রুট ক্যানেল, ছোট-বড় অস্ত্রোপচার, এমনকি ডিপ ফিলিংয়েও প্রয়োজনে লোকাল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহৃত হয়। ফাইল ছবিসতর্কতা

রোগীকে যে ধরনের অ্যানেসথেসিয়াই দেওয়া হোক না কেন, সবক্ষেত্রেই একই রকম সতর্কতা অনুসরণ করতে হবে। যেমন-

১. প্রি–অপারেটিভ অ্যাসেসমেন্ট করতে হবে রোগীকে।

২. অ্যানেসথেসিয়ার জন্য রোগীকে যে ওষুধ দেওয়া হবে সেটি রোগীর নেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, সেই ওষুধ তিনি সহ্য করতে পারবেন কি না, ওষুধ দিলে তার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে কি না সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

৩. চিকিৎসা শুরু করার আগে এক ঘণ্টা বিশুদ্ধ পানি ছাড়া কিছু খাওয়া উচিত নয়। ধূমপান, চা-কফি বা অ্যালকোহল পান করা যাবে না।

৪. অবশ্যই ডেন্টিস্টকে আগের যেকোনো রোগের ইতিহাস, যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনির রোগ, রক্তের রোগ, প্রেগন্যান্সি, অ্যালার্জি, শ্বাসকষ্ট বা অন্য অস্বাভাবিক অবস্থার কথা অবহিত করতে হবে। কী কী ওষুধ সেবন করেন, তাও জানিয়ে রাখবেন।

৫. আরামদায়ক পোশাক পরিধান করবেন ও লিপস্টিক বা অতিরিক্ত মেকআপ দেওয়া উচিত নয়।

মনে রাখতে হবে, চিকিৎসার পর পুরোপুরি অবশভাব না যাওয়া পর্যন্ত খাবার গ্রহণে সতর্ক থাকতে হবে।

লেখক: ডেন্টাল সার্জন, সিকদার ডেন্টাল কেয়ার, মিরপুর