স্তন ক্যান্সার বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হলো ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে

স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে গতকাল মঙ্গলবার এক সেমিনারের আয়োজন করা হয় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।  সেমিনারটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগ, ‘আমরা নারী’ এবং এর সহযোগী সংগঠন ‘আমরা নারী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’। 

অক্টোবর মাস বিশ্বব্যাপী ‘পিঙ্ক মান্থ’ বা স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। এরই অংশ হিসেবে মঙ্গলবার ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম হলে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কে একটি সেমিনার ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজিস্ট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ও ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন অধ্যাপক ডা. ইশরাত জাহান (ইলা)। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আলোচনায় অংশ নেন পাবলিক হেলথ বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. এ. বি. এম. আলাউদ্দিন চৌধুরী, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা (স্ট্র্যাটেজি ও ইনোভেশন) প্রফেসর গিয়াস উদ্দিন আহসান, ফ্যাকাল্টি অব হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস-এর ডিন প্রফেসর ডা. এস. এম. মহবুব উল হক মজুমদার, এবং পাবলিক হেলথ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক  ডা. নাদিরা মেহরিবান। 

অনুষ্ঠানে ‘আমরা নারী’ ও ‘আমরা নারী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়কারী এম এম জাহিদুর রহমান বিপ্লব বলেন, ‘নারীদের নিজেদের প্রতি যত্নবান হতে হবে। নিয়মিত আত্মপরীক্ষা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ভয় না পেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া—এই পদক্ষেপগুলোই স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আমরা চাই, স্তন ক্যান্সার আর মৃত্যুর প্রতীক না হয়ে সচেতনতার প্রতীক হয়ে উঠুক।’ 

তিনি আরও জানান, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে ঢাকাসহ সারাদেশে মোট ৫০টি সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ক্যাম্পেইনের আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

‘আমরা নারী’ একটি অরাজনৈতিক ও অলাভজনক সংগঠন, যা নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে নিবেদিতভাবে কাজ করে আসছে। এর সহযোগী সংগঠন ‘আমরা নারী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নারীর অধিকার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।

গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৩,০০০ নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক মৃত্যুবরণ করেন প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত না হওয়ার কারণে। দেশের মোট ক্যান্সার রোগীদের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত। নিয়মিত আত্মপরীক্ষা, ম্যামোগ্রাম এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করলে এই মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের বক্তব্যে স্তন ক্যান্সার সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। তাঁরা বলেছেন যে, স্তন ক্যান্সার মূলত স্তনের কোষে অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফল। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসা শুরু করলে এই রোগ শতভাগ নিরাময়যোগ্য। সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও আধুনিক ইমিউনোথেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা বর্তমানে অত্যন্ত কার্যকর। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন।

স্তন ক্যান্সার নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। এটি স্তনের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে ঘটে, যখন কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং টিউমার তৈরি করে। প্রথমদিকে এই পরিবর্তন দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা থাকলে তা সহজেই শনাক্ত করা যায়।

স্তন ক্যান্সার সাধারণত দুটি পর্যায়ে দেখা দেয়,

১. প্রাথমিক বা নন-ইনভেসিভ পর্যায়, যেখানে ক্যান্সার কোষ এখনো আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েনি। এই পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে প্রায় শতভাগ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।

২. ইনভেসিভ পর্যায়, যেখানে ক্যান্সার কোষ শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা অনেক সময় জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঝুঁকির কারণগুলো হলো; বয়স, পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস, হরমোনজনিত ওজন বৃদ্ধি, ধূমপান-মদ্যপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক অনিয়ম। এই কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব।

সতর্কতার লক্ষণসমূহ, স্তনে নতুন কোনো গুটি, ত্বকের কুঁচকানো, বোঁটা থেকে অস্বাভাবিক স্রাব, স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন। এসব পরিবর্তনই বড় সতর্কবার্তা হতে পারে।

পরীক্ষা ও চিকিৎসা:

নির্ভুল পরীক্ষার মধ্যে ম্যামোগ্রাম, আল্ট্রাসনোগ্রাফি এবং প্রয়োজনে বায়োপসি অন্যতম। প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক নির্ণয়ই জীবন রক্ষার সবচেয়ে বড় উপায়। বর্তমানে সার্জারি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, এমনকি ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে ক্যান্সার কার্যকরভাবে নিরাময় সম্ভব।

তবে সবকিছুর শুরুই সচেতনতা থেকে,  সময়মতো পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ইতিবাচক মনোভাবই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।