মাইক্রোপ্লাস্টিকে কি ক্যান্সার হয়, এটা কতটা ক্ষতিকর?

সম্প্রতি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-র এক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর এক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দেশের বাজারে প্রচলিত ৩৪টি প্রধান টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টিতেই প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল বলছে, বাংলাদেশে ৭৬ শতাংশেরও বেশি (৭৬.৫%) টুথপেস্টে আছে 'মাইক্রোপ্লাস্টিক'। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা মিলছে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী এবং এটা নিয়ে এত আলোচনা কেন? আমাদের শরীরে প্লাস্টিকের এই অতিক্ষুদ্র কণা কীভাবে প্রবেশ করছে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, মানবদেহের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর? এটি কি আমাদের শরীরে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি তৈরি করছে? চলুন এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খোঁজা যাক।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?

শুরুতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক কী? সহজ করে বললে, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিকের কণাকেই বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। অর্থাৎ, আকারে এই কণাগুলো একটি চালের দানার চেয়েও ছোট। এগুলো প্রধানত দুইভাবে তৈরি হয়। প্রথমটি হলো ‘প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক,’ যা বিভিন্ন কসমেটিকস, ফেসওয়াশ বা টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবেই গুঁড়ো বা ছোট কণার আকারে মেশানো হয়, যাতে তা স্ক্রাব বা ঘর্ষণের কাজ করতে পারে।

আর দ্বিতীয়টি হলো ‘সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক,’ যেটা আমাদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বোতল, শপিং ব্যাগ বা প্যাকেজিং থেকে রোদের তাপ, আলো ও ঘর্ষণে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে বাতাসে ও পানিতে ছড়িয়ে পড়ে। 

কীভাবে মানবদেহে প্রবেশ করে? 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা আমাদের শরীরে কীভাবে প্রবেশ করে? উত্তরটা হচ্ছে, আমাদের মনের অজান্তেই, নানাভাবে। প্রথমত, খাবার ও পানির মাধ্যমে। আমরা প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাচ্ছি, ওয়ান-টাইম কাপে চা বা প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখছি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডে সবজি কাটা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু প্রসেসড টি-ব্যাগ থেকেও ফুটন্ত পানিতে প্লাস্টিকের কণা ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া সামুদ্রিক মাছ ও বাণিজ্যিক লবণেও এটি পাওয়া গেছে। 

এছাড়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বাতাস থেকেও এই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানবদেহে প্রবেশ করছে। সিন্থেটিক কাপড়ের তন্তু এবং ঘরের বাতাসে থাকা ধুলাবালির সাথে এসব কণা প্রতিনিয়ত ফুসফুসে ঢুকছে। 

পাশাপাশি টুথপেস্ট ও নানা প্রসাধন সামগ্রী থেকেও এগুলো আমাদের শরীরে ঢুকতে পারে। এই যেমন প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করার সময় টুথপেস্টে থাকা কণা কুলি করার পরেও পেটে চলে যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি কেননা তাঁরা অনেক সময়ই টুথপেস্ট গিলে ফেলে। 

এখানেই শেষ নয়। এমনকি মায়ের কাছ থেকেও শিশুর শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গবেষণায় রক্ত, প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল এবং এমনকি বুকের দুধেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। 

মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক?

শরীরে ঢোকার পর এসব প্লাস্টিক কণা কিন্তু বসে থাকে না। এরা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এর মধ্যে আছে হৃদরোগ ও রক্তনালীর জটিলতা। ২০২৪ সালে ইতালিতে হওয়া এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের রক্তনালীতে জমা হওয়া চর্বির ভেতর ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। এটি রক্ত জমাট বাঁধানো এবং হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। 

এছাড়া কোষের ক্ষতি ও সাইটোটক্সিসিটিও ঘটাতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। রক্তের মাধ্যমে অতিক্ষুদ্র কণাগুলো কোষের ভেতরে প্রবেশ করে কোষের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ করে দেয় এবং কোষের দ্রুত মৃত্যু ঘটায়। পাশাপাশি বাতাসে থাকা প্লাস্টিক ফুসফুসে জমা হয়ে অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট এবং ক্রনিক কাশি ও প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। 

স্বাস্থ্যঝুঁকির এখানেই শেষ নয়। মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে হরমোন ও প্রজনন সমস্যাও তৈরি হতে পারে। প্লাস্টিক নরম ও দীর্ঘস্থায়ী করতে ‘বিপিএ’ ও ‘ফ্যাথালেটস’-এর মতো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। শরীরে ঢুকে এগুলো হরমোনের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট করে, যার ফলে থাইরয়েড সমস্যা এবং নারী-পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে বা বন্ধ্যাত্ব দেখা দিতে পারে। 

এছাড়া পরিপাকতন্ত্রেরও ক্ষতির কারণ হতে পারে এই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে হজমে মারাত্মক গোলযোগ তৈরি করতে পারে। 

মাইক্রোপ্লাস্টিকে কি ক্যান্সার হয়? 

এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। মাইক্রোপ্লাস্টিক কি ক্যান্সার সৃষ্টি করে? বিজ্ঞানসম্মত উত্তরটা হলো, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে সরাসরি ও নিশ্চিতভাবে ক্যান্সার তৈরি করে, এমন প্রত্যক্ষ চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও বিজ্ঞানীদের হাতে আসেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটিকে সরাসরি কার্সিনোজেন বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে ঘোষণা করেনি। 

তবে, এখানে একটি বড় ‘কিন্তু’ রয়েছে। সরাসরি না হলেও, এটি পরোক্ষভাবে ক্যান্সারের পটভূমি তৈরি করে। কীভাবে? 

প্রথমত, শরীর থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বের হতে না পেরে টিস্যুতে ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ তৈরি করে। বিজ্ঞান বলে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহই হলো ক্যান্সারের অন্যতম বড় অনুঘটক। 

দ্বিতীয়ত, প্লাস্টিকে থাকা রাসায়নিকগুলো রক্তে মিশে কোষের ডিএনএ-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বাড়ায়। ডিএনএ বিকৃত হলে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি শুরু হয় এবং এটাই মূলত ক্যান্সার। অর্থাৎ, সরাসরি ক্যান্সার সৃষ্টি না করলেও শরীরকে ক্যান্সারের জন্য উর্বর জমিতে পরিণত করে এই মাইক্রোপ্লাস্টিক। 

উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন কারা? 

মানবদেহে এই 'সাইলেন্ট কিলারের' উপস্থিতির কারণে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে শিশুরা। কেননা শিশুদের অর্গান বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকে, অর্থাৎ বাড়ন্ত অবস্থায় থাকে। ইএসডিও-র গবেষণায় দেখা গেছে, ৬টির মধ্যে শিশুদের জনপ্রিয় ৪টি টুথপেস্টেই মিলছে প্লাস্টিক কণা। শিশুরা প্রায়শই ভুলবশত টুথপেস্ট গিলে ফেলে, ফলে তাদের বিকাশ ও প্রজননতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে। এছাড়া, যারা টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল কারখানায় কাজ করেন, তারা এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছেন মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে। 

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সরকারের করণীয় 

স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, টুথপেস্ট বা খাদ্যপণ্যজাতীয় স্পর্শকাতর জায়গায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা হওয়া উচিত ‘জিরো’। কাঁচামালের খরচ কমাতে টুথপেস্টে এর ব্যবহারকে তারা ভোক্তাদের সাথে একপ্রকার প্রতারণা হিসেবে দেখছেন। 

এখানে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যেমন, বিএসটিআই-এর মতো মাননিয়ন্ত্রক সংস্থাকে টুথপেস্ট ও কসমেটিকসে প্লাস্টিকের অতি ক্ষুদ্র দানা বা মাইক্রোবিডসের ব্যবহার দ্রুত আইন করে নিষিদ্ধ করতে হবে, যেমনটা আমেরিকা ও ইউরোপে করা হয়েছে।

এছাড়া কোনো পণ্যে পলিমার বা প্লাস্টিক উপাদান থাকলে তা প্যাকেটের গায়ে স্পষ্টভাবে লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি ল্যাব টেস্টিং ও নজরদারি বাড়াতে হবে সরকারের তরফ থেকে। বাজারে থাকা দেশি-বিদেশি সব ব্র্যান্ডের পণ্যের নিয়মিত ল্যাব টেস্ট নিশ্চিত করতে হবে। 

ব্যক্তিগত পর্যায়ে করণীয় 

আইন তো সরকার করবে, কিন্তু নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে ভোক্তা পর্যায়েও কিছু করণীয় রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনে টুথপেস্টের মতো পন্য কেনার আগে অবশ্যই পণ্যের গায়ে লেবেলে পলিইথিলিন (পিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি) বা পিইটি'র মতো উপাদান আছে কিনা তা দেখে নেওয়া উচিত। এসব উপাদান থাকলে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। 

এছাড়া যতটা সম্ভব প্লাস্টিক বর্জন করা উচিত। এই যেমন, প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডের বদলে কাঠের বোর্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।। প্লাস্টিকের বক্সে গরম খাবার রাখা এবং মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করা উচিত। এক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পানির বোতল ও পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে দাঁত মাজার পর ভালো করে কুলি করার অভ্যাস করানো উচিত এবং দাঁত ব্রাশের সময় তারা যাতে টুথপেস্ট গিলে না ফেলে সেদিকে সতর্ক থাকা উচিত। 

সর্বোপরি, প্লাস্টিক মুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলা একদিনে সম্ভব নয়। তবে আমাদের ছোট ছোট সচেতন পদক্ষেপই পারে পরিবারকে এই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখতে।