গরম ভাতের সাথে আড়িয়াল বিলের তাজা কই, বাটা কিংবা পুঁটি মাছের ঝোল—কার না জিভে জল আনে? কিন্তু জানেন কি, পরম তৃপ্তি নিয়ে যে মাছটি খাচ্ছেন, তাতে লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক বিষ। ঠিকই শুনেছেন। আড়িয়াল বিলের দেশি মাছেও মিলেছে বিপজ্জনক মাইক্রোপ্লাস্টিক। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক সম্প্রতি এই তথ্য উন্মোচন করেছেন। কিন্তু কীভাবে দেশি মাছেও ঢুকে পড়ছে প্লাস্টিক? ছোট মাছ খাওয়াও কি এখন ঝুঁকিপূর্ণ? চলুন, সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে মাছে আসছে?
ঘটনার গভীরতায় যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া যাক—এই মাইক্রোপ্লাস্টিক জিনিসটা আসলে কী? খুব সহজ কথায়, প্লাস্টিকের যেকোনো কণা যার আকার ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট, তাকেই বলে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এটি কিন্তু এমনি এমনি তৈরি হয় না। আমরা যে প্লাস্টিকের বোতল বা পলিথিন ফেলে দিই, সেগুলো বছরের পর বছর রোদ ও পানিতে পচে ছোট ছোট কণায় ভেঙে যায়। এ ছাড়া আমাদের কাপড়ের তন্তু, গাড়ির টায়ারের ক্ষয়, এমনকি প্রসাধনী থেকেও এসব সূক্ষ্ম প্লাস্টিক বের হয়। বৃষ্টি ও ড্রেনের পানির মাধ্যমে এসব সোজা গিয়ে পড়ে আমাদের নদী, খাল আর বিলে। আর বিলে থাকা মাছগুলো যখন খাবার খোঁজে বা পানি খায়, তখন খাবারের সাথেই এই প্লাস্টিকের কণাগুলো তাদের শরীরে প্রবেশ করে।
আড়িয়াল বিলে কী পাওয়া গেল?
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে একদল গবেষক আড়িয়াল বিলে একটি গবেষণা চালান। তারা বর্ষা, শীত ও শুষ্ক—এই তিন মৌসুমে বিলের বিভিন্ন স্থান থেকে পানি, তলানির মাটি এবং ১৫০টি মাছের নমুনা পরীক্ষা করেন। গবেষণায় দেশি ৫টি প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। সেগুলো হলো—কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো—সব মাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে। কারণ কই হলো সর্বভুক মাছ, যা পানির ওপর থেকে শুরু করে তলদেশের কাদা-মাটি পর্যন্ত সবকিছুই খায়।
গবেষকেরা দেখেছেন, বিলের পানির চেয়ে তলানির মাটিতে প্লাস্টিকের পরিমাণ ছিল বেশি। আর শীত বা শুষ্ক মৌসুমে এই প্লাস্টিকের আকার বড় হতে দেখা গেছে।
কেন চিন্তা বাড়ছে?
এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—মাছের পেটে প্লাস্টিক থাকা কি খুব অস্বাভাবিক? না, গবেষকেরা বলছেন মাছের নাড়িভুঁড়ি বা পাকস্থলীতে প্লাস্টিক থাকা খুব একটা কাল্পনিক বিষয় নয়। কারণ কাদা-পানির সাথে তারা এটা গিলে ফেলে। সাধারণত মানুষ মাছের নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিয়ে রান্না করে। কিন্তু বিপদ অন্য জায়গায়। আড়িয়াল বিলের এই গবেষণায় মাছের মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, মাছের যে অংশটি আমরা সোজা চিবিয়ে খাই, প্লাস্টিক পৌঁছে গেছে ঠিক সেখানেই।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কোনটা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ? ছোট মাছ না বড় মাছ? গবেষকদের মতে, ছোট মাছ মানুষ সাধারণত পেটের ভেতরের অংশ বা নাড়িভুঁড়িসহ রান্না করে ফেলে। সেই হিসাবে ছোট মাছে প্লাস্টিক পেটে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে বড় বা ছোট—কোন মাছে ঠিক কতটা বেশি, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। শুধু আড়িয়াল বিলই নয়, এর আগে বুড়িগঙ্গা নদী, চলনবিল, হাওর, এমনকি সমুদ্রের মাছ ও শুঁটকিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে শুঁটকিতে।
মানবদেহে এর প্রভাব কতটা মারাত্মক?
এবার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই মাছ খেলে কি আমরা এখনই অসুস্থ হয়ে পড়ব? গবেষকেরা আশ্বস্ত করে বলছেন, মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার মানেই কালকে সকালে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন—এমন নয়। অধ্যাপক মো. শাহজাহান জানান, আমাদের শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি বড় অংশ মলমূত্রের সঙ্গে বের হয়ে যেতে পারে। তবে চিন্তার বিষয় হলো অন্য জায়গায়!
এই মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো যখন আরও ভেঙে অতিসূক্ষ্ম ন্যানোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়, তখন তা আমাদের রক্তপ্রবাহে এবং শরীরের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ক্যানসার সেল তৈরি করা কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমনকি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের মস্তিষ্কেও সাধারণের চেয়ে ১০ গুণ বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এই প্লাস্টিক কণাগুলো সিসা বা পারদের মতো ভারী বিষাক্ত ধাতু শোষণ করে শরীরে বয়ে নিয়ে আসে, যা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত বিপজ্জনক।
প্রতিবছর শত শত টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী ও বিলে ফেলছি আমরাই। আড়িয়াল বিলের সব সংযোগ খাল এখন বন্ধের পথে বর্জ্যের কারণে। প্রকৃতিতে আমরা যে প্লাস্টিক ফেলছি, দিনশেষে ঘুরেফিরে তা আমাদের খাবারের প্লেটেই ফিরে আসছে। মাছ খাওয়া ছেড়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়, সমাধান হলো প্লাস্টিক দূষণ বন্ধ করা। পলিথিন বা প্লাস্টিক যত্রতত্র ফেলা বন্ধ না করলে, আমাদের ভবিষ্যৎ আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে।