জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধে জার্মানির শারিতে হাসপাতালের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ

বাংলাদেশে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, রোগনির্ণয় ও আধুনিক চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত শারিতে ইউনিভার্সিটি মেডিসিন বার্লিন পরিদর্শন করেছে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। শনিবার অনুষ্ঠিত এ সফরে বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও কারিগরি সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী শাখাওয়াত হোসেন বকুল। সহ-নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার। শারিতে হাসপাতালের পক্ষে নেতৃত্ব দেন স্ত্রীরোগজনিত ক্যানসার চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. জালিদ সেহৌলি।

বৈঠকে বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিনিধি ক্যাথরিন ও তার সহকর্মীরা এবং জার্মান হেলথ অ্যালায়েন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লারা প্যাটারসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চিকিৎসানির্ভর কাঠামো থেকে প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উপযোগী ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ সফর অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে নারীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগে অকালমৃত্যু কমানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) ও ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে ক্যানসার প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ কার্যক্রমকে সমন্বিত করা, যাতে নারীরা নিজ নিজ এলাকার কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারেন।

পাশাপাশি রোগ শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা, রোগনির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির সম্প্রসারণ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শারিতে হাসপাতাল পরিদর্শনকালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারের সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা, আধুনিক রোগনির্ণয় প্রযুক্তি, বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে রোগী ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসাসেবার সঙ্গে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যুক্ত করার বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে।

বৈঠকে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শারিতে হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, অভিজ্ঞতা বিনিময়, ক্লিনিক্যাল মেন্টরশিপ এবং আধুনিক চিকিৎসাপ্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।

এ ছাড়া ক্যানসার রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, মানসম্মত চিকিৎসা প্রটোকল, সেবার গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল জানায়, ক্যানসারে মৃত্যুহার কমাতে শুধু বিশেষায়িত হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের শনাক্ত করা, নিয়মিত স্ক্রিনিং, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগনির্ণয়, দ্রুত রেফারেল এবং রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

আলোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী শাখাওয়াত হোসেন বকুল নারীদের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়াতে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, দেশের সব অঞ্চলের নারীর জন্য আধুনিক, ন্যায়সংগত ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিশ্বের অগ্রসর চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে রোগের জটিল পর্যায়ে চিকিৎসা দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতি থেকে প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও সময়মতো কার্যকর চিকিৎসানির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তরের সরকারি পরিকল্পনা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এ দুটি রোগে নারীদের অকালমৃত্যু অব্যাহত থাকা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে কমিউনিটি পর্যায়ের সচেতনতা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রমের সঙ্গে রোগনির্ণয়কেন্দ্র, বিশেষায়িত হাসপাতাল, চিকিৎসা এবং পরবর্তী ফলোআপ সেবার কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে হবে।

ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক ও ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় বাংলাদেশে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ এবং চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শারিতে হাসপাতালের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারত্ব এ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক চিকিৎসা দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

আলোচনা শেষে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ও শারিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা গড়ে তোলার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে।

আলোচনায় চিহ্নিত অগ্রাধিকারভিত্তিক ক্ষেত্রগুলোতে কারিগরি সহযোগিতা বাস্তবায়ন এবং সম্ভাব্য প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারত্বের কাঠামো নির্ধারণে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি সমন্বিত, সহজলভ্য ও টেকসই ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসারে নারীদের অকালমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের সব এলাকার নারী যেন আর্থসামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে সময়মতো মানসম্মত প্রতিরোধমূলক, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা পান, তা নিশ্চিত করা।

বার্লিনের শারিতে হাসপাতালে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের এ সফর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারীস্বাস্থ্যে কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক, জনবান্ধব ও প্রতিরোধমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।