করোনার চেয়েও ভয়ংকর মহামারি তৈরি করতে পারে পরিচিত এই ভাইরাস

হাইলি প্যাথোজেনিক অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু। হাঁস-মুরগি থেকে শুরু করে গরু, এমনকি বিড়ালের মতো বন্য ও গৃহপালিত পশুপাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাসটির নাম এতদিনে না শোনার কথা নয়। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশে ৪ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন এই ভাইরাসে।

তবে ফ্রান্সের আনস্তিতিউত পাস্তখ্‌ রেস্পিরেটরি ইনফেকশনস সেন্টারের গবেষণার তথ্য এই ভাইরাস নিয়েই শঙ্কা বাড়িয়ে তুলবে। সংস্থাটির প্রধান বলেছেন, এখন পর্যন্ত পাখি থেকে পাখি বা পশু ও আক্রান্ত পশু-পাখি থেকে মানুষে ছড়ানো এই ভাইরাস রূপ বদলে যদি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর অবস্থায় চলে যায়, সে ক্ষেত্রে এটি করোনাভাইরাসের চেয়েও ভয়ংকর মহামারিতে রূপ নেবে।    

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ড ফ্লুর সংক্রমণের কারণে লাখে লাখে আক্রান্ত প্রাণী মেরে ফেলতে হয়েছে। যে কারণে মাংসজাত খাদ্যের সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে এই ভাইরাসের সংক্রমণের হার অনেক কম, তবে বাড়ছে।

গত সেপ্টেম্বরে আইসিডিডিআরবি গোলটেবিল আলোচনায় হালনাগাদকৃত তথ্যে জানায়, ২০২৫ সালে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে মানবদেহে বার্ড ফ্লু ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আটটি দেশে মোট ৩০টি সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে, এর মধ্যে ১৪টি কম্বোডিয়ায় এবং চারটি বাংলাদেশে।

এই ভাইরাস আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠার শঙ্কাই করছেন ফ্রান্সের আনস্তিতিউত পাস্তখ্‌-এর মেডিক্যাল ডিরেক্টর মারি-আন রামেই-ওয়েলতি। সংবাদসংস্থা রয়টার্সে তিনি বলেছেন, ‘এই ভাইরাস স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে অভিযোজিত হয়ে যায় কি না, এই ভয়টাই পাচ্ছি আমরা। বিশেষ করে মানুষের শরীরে যদি অভিযোজিত হয়ে যায়, মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে শুরু করে…সে ক্ষেত্রে এই ভাইরাসটা একটা মহামারিতে রূপ নেবে।’

করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে ইউরোপে যে ল্যাবগুলো সবার আগে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত করার টেস্ট তৈরি করেছে, তার মধ্যে একটি আনস্তিতিউত পাস্তখ্‌। সেটি পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বজুড়ে ল্যাবগুলোর জন্য সরবরাহ করে ফরাসি সংস্থাটি।

 

এইচ৫ বার্ড ফ্লুর বিপরীতে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি

রয়টার্সের প্রতিবেদনে লেখা, সাধারণ মৌসুমী ফ্লু বা এইচ১ বা এইচ৩ ফ্লু-এর বিরুদ্ধে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি থাকে। তবে মারি-আন রামেই-ওয়েলতি বলেছেন, এইচ৫ বার্ড ফ্লু-র বিপরীতে কোনো অ্যান্টিবডি এখনো দেখা যায়নি, যেমনটা কোভিড-১৯-এর ক্ষেত্রেও ছিল না।

তবে রামেই-ওয়েলতি বলেছেন, কোভিড মূলত আগে থেকেই সংবেদনশীল ব্যক্তিদের শরীরে বেশি আক্রমণ করলেও বার্ড ফ্লু ভাইরাস শিশুসহ সুস্থ ব্যক্তিদেরও আক্রমণ করতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে আইসিডিডিআরবি-র প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ২০০৩ সাল থেকে বার্ড ফ্লু আক্রান্ত মোট ১২ জনের মধ্যে সাতজনই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। চলতি বছরের চারজন রোগীই এক থেকে আট বছর বয়সী শিশু, যা শিশুদের ঝুঁকির মাত্রা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।

প্যারিসে তাঁর ল্যাবরেটরিতে রয়টার্সকে রামেই-ওয়েলতি বলেছেন, ‘বার্ড ফ্লু মহামারি আকার ধারণ করলে সেটি সম্ভবত খুব ভয়ংকর হবে, এমনকি আমরা এরই মধ্যে যে মহামারি দেখেছি (কোভিড-১৯) তার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।’

রয়টার্স লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রে পোলট্রি এবং ডেইরি ফার্মের গরুর মধ্যে তো বটেই, অতীতে এইচ৫ বার্ড ফ্লু ভাইরাসে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে আসার কারণেই বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হতে দেখা গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যে এই মাসে এক ব্যক্তির এইচ৫-এর আরেকটি বিরল ধরন এইচ৫এন৫-এ আক্রান্ত হওয়ার খবরে এসেছে। প্রৌঢ় এই ব্যক্তির শারীরিক আরও জটিলতা ছিল। নভেম্বরের মাঝামাঝিতে এই ব্যক্তি বার্ড ফ্লু-র এই ধরণে আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত হয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষায়, ২১ নভেম্বর মারা যান তিনি।

বার্ড ফ্লু নিয়ে নিজেদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ২০০৩ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বার্ড ফ্লু-তে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা প্রায় ১০০০, এর মধ্যে ৪৮ শতাংশই মৃত্যুবরণ করেছেন। মিশর, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে এই সংক্রমণ বেশি দেখা গেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

 

মানুষের মধ্যে মহামারি আকারে ছড়ানোর শঙ্কা এখনো কম

প্রাণীদের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থার (ডাব্লিউওএএইচ) বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান গ্রেগরিও তোরেস রয়টার্সকে বলেছেন, বার্ড ফ্লু মানুষের মধ্যে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা এখনো অনেক কম। ‘আমাদের অবশ্য (তেমন কিছু হলে) দ্রুত কাজ শুরু করার মতো প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। আপাতত আপনি নির্ভয়ে বনে-বাদাড়ে হাঁটতে পারেন, মুরগি ও ডিম খেতে পারেন, জীবন উপভোগ করতে পারেন। সম্ভাবনার বিচারে মহামারির শঙ্কা অবশ্যই আছে। তবে সম্ভাবনার হার বিচার করলে বলতে হবে, এটা এখনো অনেক কম’ – বলেছেন তোরেস।

রামেই-ওয়েলতি বলেছেন, বিশ্বকে তৈরি থাকতে হবে, যাতে বার্ড ফ্লু যদি রূপ বদলে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর মতো অবস্থায় চলেও যায়, সে ক্ষেত্রে যেন করোনা মহামারির চেয়ে ভালো প্রস্তুতি সবার থাকে। ‘এখন পর্যন্ত ইতিবাচক দিকটা হচ্ছে, কোভিডের তুলনা বার্ড ফ্লুর ক্ষেত্রে আমাদের কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনই কার্যকর। ভ্যাকসিন বানানোর মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি আছে, আমরা জানি এটার ভ্যাকসিন দ্রুত কীভাবে বানাতে হবে। কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের মজুতও তৈরি আছে, যেটা তাত্ত্বিকভাবে অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে কার্যকর হওয়ার কথা’ – বলেছেন রামেই-ওয়েলতি।