শপিং মল বা কসমেটিকস দোকানে গিয়ে নতুন লিপস্টিক বা মেকআপ ট্রাই করা অনেকেরই পছন্দ। নতুন কোনো রঙ ঠোঁটে কেমন দেখাবে, তা একটু ব্যবহার করে দেখার আগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই সাধারণ অভ্যাসই কখনো কখনো ডেকে আনতে পারে অপ্রত্যাশিত বিপদ।
সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে, লিপস্টিক টেস্টার ব্যবহার করার পর এক নারী হারপিসে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর থেকেই মেকআপের স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি খুব সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সংক্রমণের ঝুঁকি। তাই সচেতনতা জরুরি।
হারপিস কী, কেন হয়
হারপিস একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এটি হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস (এইচএসভি)-এর কারণে হয়। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করলে তা পুরোপুরি নির্মূল হয় না, বরং স্নায়ুর মধ্যে থেকে যায়। পরে সুযোগ পেলেই আবার সক্রিয় হয়ে উপসর্গ তৈরি করতে পারে।
হারপিস সাধারণত দুই ধরনের হয়। যার মধ্যে এইচএসভি-১ মুখের চারপাশে হয়। একে বলা হয় ওরাল হারপিস। আর এইচএসভি-২ হয় গোপনাঙ্গে হয়ে থাকে।
ওরাল হারপিস হলে ঠোঁটের পাশে ছোট ছোট ফোসকা, জ্বালা, চুলকানি বা ব্যথা দেখা দেয়। অনেক সময় শুরুতে ঠোঁটের চারপাশে ঝিনঝিন বা চুলকানির অনুভূতি হয়। এরপর ধীরে ধীরে ফোসকা তৈরি হয়, যা ব্যথাযুক্ত হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে প্রথম সংক্রমণে হালকা জ্বর, ক্লান্তি বা শরীর খারাপ লাগার মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।
কীভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস
হারপিস খুব সহজেই ছড়াতে পারে। এটি সাধারণত সংক্রমিত ব্যক্তির ত্বক বা লালার সংস্পর্শে এলে অন্যের শরীরে ঢুকে যায়। কারও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র শেয়ার করলে ঝুঁকি বাড়ে। এর মধ্যে অন্যতম লিপস্টিক বা লিপবাম। এটি যদি একাধিক মানুষ ব্যবহার করেন, তাহলে সেটিও সংক্রমণের মাধ্যম হতে পারে।
লিপস্টিক টেস্টার কেন ঝুঁকিপূর্ণ
মল বা কসমেটিকস শপে রাখা টেস্টারগুলো অনেকেই ব্যবহার করেন। দিনের পর দিন এগুলোতে বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শ লাগে। বেশিরভাগ সময় প্রতিবার ব্যবহারের পর সেগুলো ভালোভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয় না।
যদি কোনো ব্যক্তি আগে থেকেই হারপিসে আক্রান্ত থাকেন এবং তিনি টেস্টার ব্যবহার করেন। তাহলে ভাইরাসটি সেই লিপস্টিকের ওপর কিছু সময় থাকতে পারে। এরপর অন্য কেউ সেটি ব্যবহার করলে, বিশেষ করে যদি তার ঠোঁট ফাটা বা কাটা থাকে। তাহলে সহজেই সংক্রমণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ঠোঁট, চোখ ও মুখের অংশগুলো খুবই সংবেদনশীল। তাই এসব জায়গায় ব্যবহৃত পণ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কতটা সাধারণ এই ঘটনা
লিপস্টিক টেস্টার থেকে হারপিস ছড়ানোর ঘটনা খুব বেশি সাধারণ নয়। তবে একেবারে অসম্ভবও নয়। বিশেষ করে যেখানে অনেক মানুষ একই পণ্য ব্যবহার করেন, সেখানে ঝুঁকি থেকেই যায়।
এ ধরনের ঘটনা সামনে আসার পর চিকিৎসকরা আবারও সতর্ক করছেন। তারা বলেন, যেকোনো শেয়ার করা কসমেটিকস ব্যবহারে সাবধান থাকা উচিত।
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন
মেকআপ ব্যবহার পুরোপুরি এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। তবে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
প্রথমত, কখনোই সরাসরি টেস্টার ঠোঁট বা মুখে ব্যবহার করা উচিত নয়। অনেক দোকানে ডিসপোজেবল অ্যাপ্লিকেটর দেওয়া হয়। সেগুলো ব্যবহার করাই ভালো।
দ্বিতীয়ত, লিপস্টিক বা ফাউন্ডেশন সরাসরি মুখে না দিয়ে হাতে বা কবজিতে পরীক্ষা করা যেতে পারে। এতে রঙ ও টেক্সচার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আবার সংক্রমণের ঝুঁকিও কমে।
তৃতীয়ত, যদি ঠোঁট ফাটা, কাটা বা কোনো ধরনের ঘা থাকে, তাহলে টেস্টার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাই ভালো। কারণ এই সময় সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
চতুর্থত, সম্ভব হলে নিজের ব্যবহারের জন্য আলাদা মেকআপ পণ্য রাখা উচিত। অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
কেন সচেতনতা জরুরি
আজকাল সৌন্দর্যচর্চা শুধু ঘরে নয়, বাইরে বেরিয়েও করা হয়। শপিং মল, বিউটি স্টোর সব জায়গাতেই নতুন পণ্য পরীক্ষা করার সুযোগ থাকে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকেই জানেন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট একটি অসতর্কতা বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই মেকআপ ব্যবহারের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সৌন্দর্যচর্চা জীবনের অংশ। কিন্তু সেই সঙ্গে নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লিপস্টিক টেস্টার ব্যবহারের মতো ছোট বিষয়েও সচেতনতা প্রয়োজন। যেমন সরাসরি টেস্টার ব্যবহার না করা। ডিসপোজেবল অ্যাপ্লিকেটর ব্যবহার করা বা নিজের মেকআপ বহন করা। এই অভ্যাসগুলো আপনাকে বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, একটু সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।