কর্মজীবী দম্পতিরা যেভাবে জীবনটা সহজ করতে পারেন

‘...সে কহিল বিষণ্ণ নয়ন/ ম্লান মুখে “যেতে আমি দিব না তোমায়!”’ চেনা পঙ্‌ক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। ছুটি শেষে কর্মস্থলের উদ্দেশে ঘর ছাড়ার সময় বাবাকে জানান দেওয়া চার বছরের মেয়ের দৃঢ় অধিকার ঘোষণা। কোনো বাধা নেই, কোনো কান্না নেই। শুধু ঘোষণা আছে, যার সাথে মিশে যায় বেদনার দিঘি। এটা সে সময়ের কবিতা, বাবা–মায়ের উভয়েই কর্মজীবী—এমন ধারণা বা চর্চা ছিল না তেমন। কিন্তু এখন এটাই বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সন্তান লালন–পালনে যেমন, তেমনি নিজেদের প্রাত্যহিক কাজেও অনেক সময় গোল বেধে যায়। কিন্তু একটি পরিকল্পনা, সপ্তাহের শুরুতেই আসন্ন দিনগুলোর পরিকল্পনার ছক এঁকে নিলে অনেক কিছুই সহজ হয়ে আসে।

আগের যৌথ পরিবার এখন নেই, আগে এই অঞ্চলে যা আকছার ছিল। এখন সময়ের প্রয়োজনেই নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা ‘অণু পরিবার’ বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বিশেষত শহরাঞ্চলে এমন পরিবারই বেশি। আবার জীবনযাত্রার ব্যয় এমন মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে যে, দম্পতির উভয়কেই উপার্জনের চেষ্টা করতে হয়।

অনিক–নীলা দম্পতির কথাই ধরা যাক। অনিক কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, আর নীলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দুজনকেই জীবিকার প্রয়োজনে ছুটতে হয়। চাকরি যেহেতু, কর্মঘণ্টাও নির্দিষ্ট। ফলে তাদের তিন বছরের সন্তান নিয়ে কর্মক্ষেত্রের পুরোটা সময় এক রকম দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয়। কাছেই আত্মীয় বাড়ি থাকায় সেখানে সন্তানকে রেখে যাওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। তা–ই করেন তাঁরা। তবু মাঝেমধ্যেই নানা সংকটে অফিস থেকে ছুটি নিতে হয়—কখনো আধাবেলা তো কখনো পুরো দিনের। এমন হুজ্জতের মধ্য দিয়ে প্রায় সব কর্মজীবী দম্পতিকেই যেতে হয়।

কেউ হয়তো ঘরে কোনো আত্মীয়–বন্ধুকে, কিংবা পাশের বাসার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের কাছে সন্তানকে রেখে কাজে যান। কেউ কেউ আবার ডে–কেয়ারে রেখে যান সন্তানকে। কিন্তু খোদ রাজধানীতেই তো ডে–কেয়ারের সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় ভীষণভাবে অপ্রতুল। যাদের সন্তান স্কুলে যায়, তাদের ক্ষেত্রে আবার অন্য ধরনের সংকট। স্কুলে কে নিয়ে যাবে বা কে নিয়ে আসবে—এমন হাজার ধরনের সংকট লেগেই থাকে। দেখা যায় প্রতিনিয়ত পরিকল্পনা বদলাতে হচ্ছে।

কর্মজীবী দম্পতিদের এমন সংকট যত বিচিত্রই হোক না কেন, এর মূলে রয়েছে মূলত তিনটি বিষয়। এক, খাবার। নিজেদের ও সন্তানের খাবার। কাল সকালের খাবারটা কেমন হবে, আর রাতেরটাই–বা কেমন। সন্তান কী খাবে? তারও একটা পছন্দ–অপছন্দ গড়ে উঠেছে। ফলে তাকে তো বিবেচনায় নিতেই হবে। ফলে প্রতিদিনের এই খাবার ব্যবস্থাপনা এক নিত্য ও অলঙ্ঘনীয় সংকট হয়ে দাঁড়ায়।

দুই, তথ্যের আধিক্য। নিজেদের কর্মক্ষেত্র তো বটেই সন্তান যদি স্কুলগামী হয়, তো তারও ক্লাস–পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ইত্যাদি মিলিয়ে অসংখ্য বিষয়াদি থাকে, যার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বাবা–মায়ের ওপর এসে বর্তায়। কর্মক্ষেত্রের চাপে যা দুজনের যে কেউই ভুলে বসে থাকতে পারে। আর তা যদি সন্তান সম্পর্কিত হয়, তবে তো কথাই নেই। একে তো সন্তানকে ভুগতে হয়। আবার এই ভুলে যাওয়া নিয়ে দুজনের মধ্যে বিবাদ লেগে যেতে পারে।

তিন, পারিবারিক জীবনে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় থাকে। নিত্যদিনের এসব বিষয় হয়তো তেমন চোখে পড়ে না। কিন্তু এর কোনো একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে এদিক–ওদিক হলেই মুশকিল। অসংখ্য ছোট ছোট কাজের মধ্যে দু–একটি ছুটে গেলেই দেখা যায় গোল বেধে যায়।

চার, রোগ–শোক তো জীবনেরই অংশ। দেখা গেল অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছেন। সারা দিনের কাজের একটা যথাযথ পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের সব ব্যবস্থা করে মোটামুটি তৃপ্ত ভঙ্গিতে ঘর থেকে বের হলেন। কিন্তু অফিসে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই শুনলেন ঘরে রেখে আসা সন্তানটি অসুস্থ বোধ করছে। শুধু সন্তান কেন, নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। অসুস্থতা তো আর বলে–কয়ে আসে না। এ ধরনের বিষয় একটা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করে।

সংকট তো জানা গেল। এসব কোনো নতুন বিষয়ও নয়। কিন্তু কর্মজীবী দম্পতিদের, বিশেষত যারা নিউক্লিয়ার পরিবার গঠন করেছেন, তাঁদের জন্য নিত্যকার এসব সংকটই অনেক সময় ভীষণ দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দুর্ভাবনা থেকে মুক্তি দিতে পারে কিছু চর্চা।

যেকোনো সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো—সংকটটিকে ভালোভাবে জানা–বোঝা। কর্মজীবী দম্পতিদের মুখ্য সংকট ঘরে–বাইরে তাদের জন্য অপেক্ষারত বিচিত্র সব কাজ। এ ক্ষেত্রে কাজগুলো নিয়ে একটা যথাযথ পরিকল্পনা করা গেলে তা কিছুটা সহজ হয়ে আসে।

প্রতিদিন বসে পরিকল্পনা করাটা আরেক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। তাই সপ্তাহের শুরুতেই পুরো সপ্তাহ নিয়ে একটা পরিকল্পনা করা যেতে পারে। এ জন্য বেশি নয়, সপ্তাহের শুরুতে মাত্র ১৫–২০ মিনিট সময় দিতে হবে। তবে এই পরিকল্পনা একা একা না করে, পরিবারের সিদ্ধান্তপ্রণেতা যারা, তাদের নিয়ে বসে করতে হবে। নিউক্লিয়ার পরিবারের ক্ষেত্রে দম্পতির দুজন বসে নিজেদের কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে আসন্ন সপ্তাহে সন্তানের স্কুল বা অন্য কোনো বিষয়াদিকে বিবেচনায় নিয়ে এ পরিকল্পনা সাজাতে হবে।

প্রতীকী ছবিএই পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রাখবেন—

  • পরতি সপ্তাহের শুরুতেই আসন্ন সপ্তাহের পরিকল্পনা করুন। শুরুর বিন্দু হিসেবে শুক্রবার বা নিজের সুবিধামতো অন্য কোনো দিনকে বেছে নিন। এ বিষয়ে নিজের কাছে নিজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোন।
  • দম্পতির উভয়েই এবং পরিবারের আরও অন্য কেউ যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তবে তাদের যুক্ত করুন এ প্রক্রিয়ায়।
  • প্রত্যেকের কর্মজীবনের নানা প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিন।
  • আসন্ন সপ্তাহে কর্মক্ষেত্রে সম্ভাব্য কী কী হতে পারে, কোনো মিটিং আছে কি–না, বা কর্মী মূল্যায়ন বা এ ধরনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে কিনা, তা এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করুন এবং অন্যকেও অবহিত করুন।
  • পরিকল্পনাটি সাজানোর আগে সন্তানের প্রাত্যহিক রুটিন সম্পর্কে জেনে নিন।
  • কর্মস্থলে থাকার সময় সন্তান যেখানে বা যাদের সান্নিধ্যে থাকে, তাদের আসন্ন সপ্তাহের বিশেষ কোনো পরিকল্পনা থাকলে তা জেনে রাখুন আগেভাগেই।
  • সম্ভব হলে সপ্তাহের বাজার–রান্না ইত্যাদি সম্পর্কে আগেভাগেই পরিকল্পনা করে নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিন।
  • প্রাত্যহিক জীবনে অন্য অনেক মানুষ যুক্ত হয়ে পড়ে। তাদের সম্পর্কেও যতটা সম্ভব ওয়াকিবহাল থাকুন।
  • এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, আসন্ন সপ্তাহে কী ঘটতে যাচ্ছে, সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য জোগাড় করা ও তা নথিভুক্ত করা।
  • সর্বশেষ এই কাজের তালিকা ও এ সম্পর্কিত পরিকল্পনা নিজেদের মধ্যে শেয়ার করে নিন। শেয়ার করার সবচেয়ে ভালো পন্থা গুগল ডকে শেয়ার করা। এতে পূর্বানুমানের বাইরে কিছু ঘটে গেলে তাও সেখানে আপডেট করা যাবে, যা গোটা পরিকল্পনাকেও আপডেট করবে।
  • সব দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে একাই গুছিয়ে ফেলব—এমন ভাবনা সংকট বাড়ায়। তাই সঙ্গীর সাথে সমস্যা–সম্ভাবনা শেয়ার করতে ভুলবেন না।

সমস্যা যেমন আছে, তার সমাধানেরও তরিকা আছে। ওপরের এই পদ্ধতিতে হয়তো মুশকিল আসান পুরোপুরি হবে না। কিন্তু অগোছালো পরিস্থিতি কিছুটা হলেও কমবে। এর বাইরে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি হিসেবে অসুস্থতা বা অন্য কোনো অনভিপ্রেত পারিবারিক সংকট আসতেই পারে। নিজেদের মধ্যে সপ্তাহের পরিকল্পনাটি শেয়ার করা থাকলে, সেই উদ্ভূত পরিস্থিতি কে কীভাবে সামাল দেবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হবে। সন্তানকে সময় দেওয়াটাও সহজ হবে, কর্মজীবী দম্পতির সন্তানেরা যার অভাবে ভোগে সবচেয়ে বেশি।

শেষ কথা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়। করণীয়র তালিকা বড় মনে হলেও এটি একবার শুরু করলে পরবর্তী সপ্তাহগুলোর শুরুতে এতে ১৫–২০ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। আরেকটি কথা—কাজটি এক সপ্তাহে করলাম, তারপর অনিয়মিত হয়ে হয়ে গেল, এমন হলে হবে না। প্রতি সপ্তাহেই এটি করা চাই। বাজারের ফর্দ করার মতো একটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেললে বিষয়টি সহজ হয়ে আসবে। তখন ওই সন্তানকে একলা রেখে যাওয়ায় হয়তো মন কেমন করবে, কিন্তু অতিরিক্ত দুর্ভাবনা থাকবে না।

তথ্যসূত্র: হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ, দ্য মিন্ট