বন্ধুত্ব মানে হৃদ্যতার এক বন্ধন। যে বন্ধনে একে অপরকে বিশ্বাস করা যায়। বন্ধুত্বের গভীরতা আকাশের মতো বিশাল। যেখানে স্বার্থের কোনো ছোঁয়া নেই, সেখানেই নির্দ্বিধায় বলা যায় মনের সব কথা। মানুষের জীবনে বন্ধুর প্রয়োজন অনেক বেশি। মানুষ সুখে-দুঃখে, বিপদে–আপদে নির্ভরতা খোঁজে বন্ধুর কাছেই। জীবনের কঠিন সময়ে যিনি ছায়া হয়ে পাশে থাকেন, তিনিই হন পরম বন্ধু।
বন্ধু যখন মা
আর এই বন্ধুটি যদি হন মা, তাহলে তো আর কোনো কথা থাকতে পারে না। মা তো মা-ই। পৃথিবীর সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে মায়ের স্থান। যখন মা বন্ধু হন, তখন সন্তান মাকে মন খুলে সব কথা বলতে পারে। তবে মানুষের সঙ্গে মানুষের বন্ধুত্ব আপনাআপনি জন্মায় না। সন্তান মায়ের কাছে এবং মা সন্তানের কাছে যতই নিজের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করবে, ততই তাদের বন্ধন অটুট হবে।
মা যখন ছায়াসঙ্গী
একুশে পদক প্রাপ্তচিত্র শিল্পী কনক চাঁপা চাকমা। আজ থেকে সাত বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। স্বামী মিঠুর মৃত্যুর পর তিনি ভীষণ একা হয়ে পড়েন। একাকিত্ব তাঁকে বিমর্ষ করে তোলে। শত চেষ্টা করেও কাজে মন দিতে পারছিলেন না। সে সময় বন্ধুর মতো পাশে ছিলেন তাঁর মা সরত মালা চাকমা। সুখে-দুঃখে, বিপদে মেয়ের পাশে ছিলেন তিনি। বন্ধু হিসেবে তিনি ছিলেন অতুলনীয়।
মাকে নিয়ে কনক চাঁপা চাকমা বলেন, ‘আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি খুব একা হয়ে পড়ি। মা সে সময়টাতে বন্ধুর মতো পাশে ছিলেন। বিয়ের পর স্বামী ছিলেন আমার বন্ধু। কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার পর মা আমার পরম বন্ধু হিসেবে আমার জীবনে আসেন। তবে মায়ের সঙ্গে আমার হৃদ্যতা প্রকাশ পায় যখন আমি চারুকলায় পড়তে ঢাকায় আসি। মায়ের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে আসি। কিন্তু শত মাইল দূরে থেকেও সে সময় মা আমার পাশে ছিলেন। প্রতিদিন মোবাইল ফোনে কথা বলতেন। এই সময়টাতে মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক গভীর হয়। মা আমার জীবনের চলার পথকে অনেক সহজ করে দেন। এখন আমার মা নেই। এটা আমার জন্য অনেক কষ্টের বিষয়। গত বৈশাখে মাকে হারিয়েছি। প্রতি মুহূর্তে মাকে মনে পড়ে।’
প্রাণের সখা যখন মা
নৃত্যসারথি লায়লা হাসানের কন্যা সঙ্গীতা ইমাম। একান্নবর্তী পরিবারের জন্মেছেন সঙ্গীতা। লায়লা হাসান মঞ্চ, নৃত্য, বেতার ও টেলিভিশনে অভিনয়ের পাশাপাশি সন্তানের পাশে বন্ধুর মতো ছিলেন। সঙ্গীতা ইমামের নাচের প্রথম গুরু তাঁর মা। তাই নাচ শিখতে শিখতে একে অপরের বন্ধু হয়েছেন।
মায়ের পাশাপাশি ছোটবেলায় দাদির সঙ্গেও বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি হয় সঙ্গীতা ইমামের। মাকে নিয়ে সঙ্গীতা ইমাম বলেন, ‘আমার শাড়ি পরা, টিপ দেওয়া, খোঁপায় ফুল পরা দেখে অনেকেই বলেন, “একদম মায়ের মতো”। নিজের অজান্তেই আমি মায়ের মতো হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি। আবার আমি যখন মা হয়েছি, শুরু থেকেই ঠিক করেছিলাম আমার ছেলেরাই হবে আমার নিত্যদিনের আনন্দ বেদনার বন্ধু। আমার ছেলেরা খুব ছোট বয়সে তাদের বাবাকে হারায়। ছেলেরা বড় হতে হতে যে পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে, সব আলোচনায় আমি নির্দ্বিধায় অংশ নিতাম। আমি সন্তানদের পাশে বন্ধুর হয়ে থাকার চেষ্টা করেছি। তাদেরকে শিখিয়েছি বন্ধুত্বের কোনো জেন্ডার হয় না। এখন আমার মা যেমন আমার প্রাণের সখা, তেমনি আমার সন্তানেরাও আমার পরম বন্ধু।’
দশভুজা মা যখন বন্ধু
নাট্যজগতের পরিচিত এক মুখ ত্রপা মজুমদার। ত্রপা মজুমদারের মা কিংবদন্তি অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার। ছোটবেলা থেকে মাকে বন্ধুর মতো পেয়েছেন ত্রপা। ত্রপা ছিলেন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। তাই ছোটবেলা থেকে মাকে অনেক বেশি কাছে পেয়েছেন। মায়ের কাছে ত্রপাকে তেমন কোনো কিছু লুকাতে হয়নি। সেই ছোটবেলা থেকে মাকে নির্দ্বিধায় সব কথা বলতে পেরেছেন। তাঁরা দুজন ছিলেন দুজনের বন্ধু।
মায়ের কথা বলতে গিয়ে ত্রপা বলেন, ‘আসলে বন্ধুত্ব তখনি হয়, যখন আপনি মন খুলে আপনার বন্ধুকে সব কথা বলতে পারবেন। মা আমার বন্ধু। ছোটবেলা থেকে তিনি আমার আর তাঁর মধ্যে দেয়াল তৈরি করেননি। আমাকে সময় বেশি দেওয়ার জন্য মা স্কুলের চাকরি নেন। মাকে আমার দশভুজা মনে হয়। সংসার, শিক্ষকতা আর অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি পুরো সময়টা আমাকে উজাড় করে দেন। মা সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করে বন্ধু মতো আমার পাশে ছিলেন। আজকের আমার এই আবস্থানের পুরো কৃত্বিত্ব মায়ের। আমার মা এখনো আমার বন্ধু হয়েই আছেন।’
শুধু বিশিষ্টজনেরা নন, মায়ের সাথে এমন বন্ধুত্ব আছে অনেকেরই। সন্তান মাত্রই মায়ের সাথে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। এই সম্পর্ককেই যখন বন্ধুত্বের পর্যায়ে উন্নীত করা যায়, তখন দেখা যায় সন্তান তো বটেই মাও পান এক অকৃত্রিম আশ্রয়। তবে এ আশ্রয়স্থলকে নিবীড় করে তোলার কাজটা কিন্তু উভয় পক্ষকে করতে হয়। এ জন্য দুটি প্রজন্মের মধ্যে থাকা ব্যবধান কমাতে যেমন মাকে, তেমনি সন্তানকেও উদ্যোগী হতে হয়। আজকের এই বন্ধু দিবসেই না হয় উদ্যোগটি নেওয়া যাক।