গত ৫ বছরে সংসদ সদস্যদের চেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানদের সম্পদ বেশি বেড়েছে বলে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে তিনগুণ। দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থী ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হলফনামা বিশ্লেষণ ও ফলাফল তুলে ধরে টিআইবি।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটি জানায়, এবার উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের প্রায় ৭৯ শতাংশই ব্যবসায়ী। এবার ব্যবসায়ী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৮ শতাংশ। ২০১৯ সাল থেকে ৫০ শতাংশ থেকে শতভাগ পর্যন্ত আয় বেড়েছে জনপ্রতিনিধিদের। ক্ষমতার অপব্যবহারই এর কারণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।
টিআইবি বলছে, গত ৫ বছরে একজন জনপ্রতিনিধির আয় বেড়েছে সর্বোচ্চ ৩১ হাজার ৯০০ শতাংশ এবং এ সময়ে জনপ্রতিনিধিদের স্ত্রী বা স্বামী ও নির্ভরশীলদের সম্পদ বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৪০০ শতাংশ। একই সময়ে একজন চেয়ারম্যানের অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ১১ হাজার ৬৬৬ শতাংশ। আবার ৬ষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একজন বিজয়ীর গত ৫ বছরে আয় বেড়েছে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৮৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং অস্থাবর সম্পদ সর্বোচ্চ বেড়েছে ২৩ হাজার ৯৩৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তাছাড়া, ক্ষমতায় থাকার সঙ্গে দ্রুত আয় ও সম্পদ বৃদ্ধির প্রবণতাও দেখানো হয়েছে বিশ্লেষণে।
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে টিআইবি বলছে, ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ বা ৩৯০ প্রার্থীর কোটি টাকার বেশি সম্পদ রয়েছে। ৫ বছরে প্রায় তিন গুণের বেশি হয়েছে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা। নির্বাচিতদের ১৫০ জন বা ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের ১৩২ জন বা ৩০ দশকি ৪১ শতাংশ কোটিপতি। তা ছাড়া, চেয়ারম্যান ও অন্যান্য প্রার্থীদের মাঝে উল্লেখযোগ্য আয় বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে।
টিআইবি বলছে, চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রায় ২৩ শতাংশের আয় সাড়ে ষোল লাখ টাকার ওপরে, অন্যান্য প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ হার ৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। বছরে ১০ লাখ টাকা আয় করেন এমন নির্বাচিত প্রার্থীর সংখ্যা ২৮০। নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের ৫১ শতাংশ বছরে ১০ লাখ টাকা আয় করেন। বছরে ১ কোটি টাকা আয় করেন এমন নির্বাচিত প্রার্থী আছেন ৪০ জন, এর মাঝে ২ জন ভাইস চেয়ারম্যান আর বাকি সবাই চেয়ারম্যান। আবার, আইনি সীমা ১০০ বিঘা বা ৩৩ একরের বেশি জমি আছে ২৫ জন প্রার্থীর এবং তাদের ৭ জন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। আইনি সীমার বাইরে প্রার্থীদের সর্বমোট জমির পরিমাণ ৮৭৪ একর।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে যতটুকু আয় তারা করেন এর মধ্যে এই বিশাল সম্পদের বিকাশের সুযোগটা কিন্তু থাকার কথা নয়। যতটুকু ক্ষমতা জনপ্রতিনিধি হিসেবে সেটাকে বিভিন্নভাবে অপব্যবহার করে অনেকটা আনুষ্ঠানিক অনেক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক। এই ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমেই কিন্তু এই সম্পদের বিকাশগুলো এবং বৃদ্ধিগুলো হয়েছে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও, বাস্তবে জনপ্রতিনিধিত্বের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারকেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতার বিকাশ ঘটছে। হলফনামার তথ্যের বিশ্লেষণ এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ বহন করছে। ক্ষমতায় থাকলে সম্পদ বিকাশের অবারিত সুযোগ তৈরি হয় এবং কোনো জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় না। জনপ্রতিনিধিত্বের অবস্থানকে আনুষ্ঠানিক-আনুষ্ঠানিকভাবে, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ও বিভিন্ন যোগসাজসে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ ও সম্পদ বৃদ্ধির লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে দলীয় নির্দেশনা বা শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে মুনাফাকেন্দ্রিক উদ্দেশ্য নিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বের অবস্থান দখল করা হচ্ছে। অন্যদিকে, যারা জনকল্যাণমুখী আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করতে চাইছেন, এমন পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের কোনঠাসা ভাবছেন।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ নেই, সে চিত্রও উঠে এসেছে এই নির্বাচনে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তারা যেটা বলছেন স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে দুই দলেরই স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃদ্ধ সিদ্ধান্ত মানছেন না। একটি দলের কর্মীদের নির্বাচনে অংশ নিতে না করা হয়েছে, তারা অংশগ্রহন করছেন। অন্যদলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আত্মীয়দের মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য, তারা সেটা করেছেন এবং নির্বাচিত হয়েছেন অনেকে।’
ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচনে ৮৪ ভাগ প্রার্থীর আয়কর রিটার্নের সাথে হলফনামার মিল নেই বলেও জানায় টিআইবি। জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে উপজেলা নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম, প্রায় ২ শতাংশ।