বেনজীরের সম্পদের পরিমাণ নিয়ে হাইকোর্টের বিস্ময়

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের মতো একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে অঢেল সম্পত্তির মালিক হলেন, সেই প্রশ্ন তুলে বিস্ময় প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। মঙ্গলবার দুপুরে বিচারপতি কামরুল কাদের ও খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ সাবেক পুলিশপ্রধানের কর্মকাণ্ড নিয়ে এই মন্তব্য করেন। 

যশোরে স্থানীয় সরকার বিভাগের কয়েকটি সেতু নির্মাণে অনিয়মের কারণে তলব করা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় এই প্রসঙ্গ তোলেন আদালত।

পরে মামলাটির রিটকারীর আইনজীবী শামসুল হক বলেন, ‘খুব দুর্ভাগ্যজনক পুলিশ প্রধান যিনি এবং অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট ছেলে বেনজীর, কোর্ট বললেন। এরকম মেধাসম্পন্ন ছেলে যখন সম্পদের পাহাড় গড়তে থাকে, তখন দেশ কিভাবে টিকবে?’ 

সম্প্রতি দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পদের কথা তুলে ধরা হয়। এতে দাবি করা হয়, বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, পাঁচ তারকা হোটেলের শেয়ার, গাজীপুর, কক্সবাজার, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে শত শত বিঘা জমির মালিকানা রয়েছে। 

এ খবর প্রকাশ হওয়ার পর সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের বিপুল অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে দুদকের কাছে আবেদন করেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। এর পরপরই বেনজীর আহমেদের বিপুল অবৈধ সম্পত্তির অভিযোগের অনুসন্ধান চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী সালাউদ্দিন রিগ্যান। 

এই দুই ঘটনার পর গত ১৮ এপ্রিল দুদকের সভায় সাবেক এই পুলিশ প্রধানের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এর জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করে দুদক। কমিটির সদস্যরা হলেন, দুদক উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম, সহকারী পরিচালক নিয়ামুল হাসান গাজী ও জয়নাল আবেদীন। এরই মধ্যে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, আয়কর নথি ও কোম্পানির কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক। বেনজীর ও তাঁর স্ত্রী সন্তানদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলবও করা হয়েছে। 

এরমধ্যে গত ২৩ মে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে বেনজীর আহমেদের সব ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) এবং গোপালগঞ্জ ও কক্সবাজারের তাঁর ৮৩টি দলিলের সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দেয় আদালত। আর ২৬ মে বেনজীরের স্ত্রী জিশান মির্জা, বড় মেয়ে ফারহিন রিস্তা বিনতে বেনজীর এবং ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে থাকা বিভিন্ন সম্পত্তির দলিল, ঢাকায় ফ্ল্যাট ও কোম্পানির আংশিক শেয়ার ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

দুদক বলছে, গণমাধ্যমে অবৈধ সম্পদের খবর প্রকাশের পর থেকেই সম্পদ রক্ষায় তৎপর হয়ে উঠে বেনজীর। এ সময় নিজেদের শতাধিক ব্যাংক হিসাবও বন্ধ করে দেন তিনি। একে একে ৫০টি এফডিআর ভেঙে নগদ প্রায় ১০০ কোটি টাকা তুলে নেন বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া ব্যাংকের হিসাবে থাকা আরও কয়েক কোটি টাকা এ সময় তুলে নেওয়া হয়।

এর রেশ কাটতে না কাটতেই জানা যায়, বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যরা দেশ ছেড়েছেন। গত বুধবার এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘বেনজীর আহমেদের দেশত‌্যা‌গে আদাল‌তের কোনো নি‌ষেধাজ্ঞা ছি‌ল না। তাই সে কোন দে‌শে গি‌য়ে‌ছে সেই বিষ‌য়ে সরকারের কাছে কো‌নো তথ‌্য নেই। তবে শোনা যাচ্ছে, তিনি সিঙ্গাপুরে আছেন।’

গত ৬ মে বেনজীর আহমেদকে দুদকে তলব করেছিল দুদক। এর একদিন আগে দেওয়া এক আবেদনে হাজির হতে সময় চান সাবেক পুলিশ প্রধান। পরে তাকে ২৩ জুন হাজির হতে নতুন সময় নির্ধারণ করে দুদক। তার স্ত্রী ও মেয়েরাও দুদকে হাজির হতে সময় প্রার্থনা করেছেন। 

এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ অন্তত ১০ জেলায় বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ২ হাজার ৩৮৫ বিঘা বা ৭৮৬ একর জমি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি জেলাগুলো হলো গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, সাতক্ষীরা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, বান্দরবান ও কক্সবাজার। এসব জেলায় রয়েছে জমি, খামার, রিসোর্ট। সেন্ট মার্টিন দ্বীপেও আছে জমি।