বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও আগামীকাল বুধবার জানাজা উপলক্ষে একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস মঙ্গলবার দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে এ ঘোষণা দেন।
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আজ আমাদের পুরো জাতি গভীর শোক ও বেদনায় নিস্তব্ধ। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির শীর্ষ নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’
তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। তাঁর মৃত্যুতে জাতি এক মহান অভিভাবককে হারিয়েছে। এই গভীর শোকের মুহুর্তে আমি তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং অগণিত কর্মী-সমর্থকের প্রতি সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহর কাছে আমার প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের সবাইকে এই গভীর শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি দান করেন।’
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পরম মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব। গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাঁর অসামান্য ভূমিকা ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব বারবার জাতিকে গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে এবং মুক্তির প্রেরণা যুগিয়েছে। দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর সমুজ্জ্বল অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।’
অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, গণমুখী নেতৃত্ব এবং প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখতে তাঁর অবিচল ভূমিকা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এমন একজন মহান, দূরদর্শী ও নিখাদ দেশপ্রেমিক নেত্রীর শূন্যতা পূরণ হবার নয়।’
দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই শোকাবহ মুহূর্তে আপনাদের প্রতি আমার উদাত্ত আহ্বান—আসুন আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে মহান আল্লাহর দরবারে বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘একই সঙ্গে জাতির এই কঠিন সময়ে আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ থাকি। শোকের এই সময়ে কেউ যেন অস্থিতিশীলতা বা নাশকতার অপচেষ্টা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে আমি সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। এই সময়ে আমাদের সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি।’
দেশবাসীকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমি তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং আগামীকাল তাঁর নামাজে জানাযার দিনে একদিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছি। নামাজে জানাযাসহ সব ধরনের শোক পালনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আমি সবার প্রতি বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি।’
দেশবাসীর উদ্দেশে মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমি জানি, আপনারা সবাই এই সময়ে অনেক আবেগাপ্লুত। আমি আশা করছি, শোকের এই সময়ে আপনারা ধৈর্যের পরিচয় দেবেন এবং তাঁর জানাযাসহ সকল আনুষ্ঠানিকতা পালনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে ধৈর্য, শক্তি ও ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষমতা দিন।’
এর আগে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, খালেদা জিয়ার নামাজে জানাযা আগীমাকাল বুধবার জোহরের পর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁকে দাফন করা হবে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের ঠিক পাশে।
আজ সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয় (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
এদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সাতদিনব্যাপী শোক পালন করবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ সাতদিন কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দলের সব পর্যায়ের কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, কোরানখানি ও দোয়া মাহফিল হবে। নেতাকর্মীরা পরবেন কালো ব্যাজ।
সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে এক ব্রিফিংয়ে এ কর্মসূচি তুলে ধরেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপি ও জাতি অভিভাবক হারিয়েছে উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সকল দলীয় কার্যালয়ে সাতদিন কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকল স্তরের নেতাকর্মীরা সাতদিনব্যপী কালো ব্যাজ ধারণ করবে। প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে কোরানখানি ও দোয়া হবে সাতদিন।
এছাড়া বিএনপির গুলশান ও নয়া পল্টনের কার্যালয় এবং জেলা পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলোতে শোক বই রাখা হবে বলে জানান রিজভী। এসব শোকবইয়ে স্থানীয় রাজনীতিবিদসহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ প্রয়াত খালেদা জিয়া সম্পর্কে মন্তব্য লিখতে পারবেন।