পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দীর্ঘ ২৮ বছরেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় পাহাড়ে মানবাধিকার পরিস্থিতির ‘আরও অবনতি হয়েছে’ বলে মনে করছে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর সংগঠনটির ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে এ অবনতির চিত্র উঠে এসেছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী, সশস্ত্র রোহিঙ্গা, ‘মুসলিম বাঙালি সেটেলার’ ও ‘ভূমিদস্যুদের’ হাতে ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা হয়েছে। এই সময়ে মানবাধিকার সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সমিতির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সকল ঘটনায় ৬০৬ জন জুম্ম নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন এবং ১৯৩টি জুম্ম অধ্যুষিত গ্রামে অভিযান চালানো হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে ৮ জন জুম্মকে বিচার-বহির্ভূত হত্যা, ১১৭ জন জুম্মকে গ্রেপ্তার, দুটি বৌদ্ধ মন্দিরসহ ৪৩টি বাড়িতে তল্লাশি, ৩২ জন জুম্ম নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা এবং ৩০ ম্রো শিশুকে ধর্মান্তর করা হয়েছে। এছাড়া অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারধর, হত্যা, গুলিতে আহত, তল্লাশি, হত্যার হুমকি, টাকা ও মোবাইল ছিনতাই, চাঁদা দাবি ঘটনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ফলে চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ ও দেশের আদিবাসী জনগণের ওপর ব্যাপক আকারে দুটি নৃশংস সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা হয়েছে। এছাড়া বহিরাগত কোম্পানি, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সেটেলার কর্তৃক কমপক্ষে ৩০০ একর ভূমি বেদখল করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সংবিধানসহ সংস্কার কার্যক্রমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আলোচনার বাইরে রাখা হয়।
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী আশা করেছিল, আদিবাসীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান বৈষম্য ও নিপীড়নসমূহ চিহ্নিত করে তা অবসানের লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপের সুপারিশ গ্রহণে আলাদাভাবে একটি সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা হবে। কিন্তু কোনো আলাদা কমিশন গঠন করা হয়নি। পরবর্তীতে যে সকল কমিশন গঠন করা হয়েছে সেখানেও আদিবাসীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। এমনকি সংবিধান সংস্কার কমিশনেও কোনো সংখ্যালঘু প্রতিনিধি ছিলো না।
সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান বৈষম্য নিয়ে কমিশনগুলো কোনো সংখ্যালঘু প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেনি।
এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার গৃহীত জুলাই সনদেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ করা হয়নি। যা বর্তমান সরকারের আমলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি গভীর বৈষম্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। এ সকল বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।