শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘বেতার কেন্দ্র’ দখলের অভিযোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বাচনে কারচুপিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ তার শাসনামল। এবার সেই সময়ে বাংলাদেশ বেতারে সংঘটিত বেশকিছু চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা তুলে ধরে তথ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নাট্যকার, উপস্থাপক ও আইনজীবী জোবাইদুল ইসলাম। তাঁর দাবি, গত ১৭ বছর (২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল) বাংলাদেশ বেতারে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীরা বেশ ক’জন কর্মকর্তার যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা লুটপাট ও আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ বেতার কেন্দ্র দখলেরও অভিযোগ উঠেছে।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাজধানীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ বেতারে নানা দুর্নীতি, অনিয়ম ও দখলদারিত্ব নিয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেন জোবাইদুল ইসলাম। যেখানে তিনি সুস্পষ্টভাবে ১২টি অভিযোগ উল্লেখ করেছেন।

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর কণ্যা শেখ হাসিনার গুণকীর্তনে গান-নাটক তৈরি করে কোটি-কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে’—এমন দাবি করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, ‌বেতারে গত ১৭ বছরে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীরা কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে লুটপাট ও ধ্বংস করেছে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার গুণকীর্তনে গান-নাটক করে কোটি-কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। কয়েক শতাধিক গান রেকর্ড করে ঢাকা বেতারের লবিতে ২৪ ঘণ্টা বাজানো হতো। আর এই গান করেছে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট শিল্পী ও কতিপয় কর্মকর্তারা। বিষয়টি তদন্ত করে কত টাকা লুট হয়েছে এবং কারা জড়িত—তা বের করা উচিৎ।

স্টুডিও সংস্কার প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলা হয়, ‌‌ঢাকা কেন্দ্রের ৫টি স্টুডিও সংস্কারের জন্য ৭৯ কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে তৎকালীন মন্ত্রী‌, সচিব ও কর্মকর্তারা অর্থ আত্মসাৎ করেছে। প্রথমে মন্ত্রণালয় ২৫ কোটি টাকার প্রজেক্ট বানায়। এরপর মন্ত্রী, সচিব ও বেতারের কর্মকর্তারা কারণ ছাড়া ৭৯ কোটিতে উন্নীত করে। যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নের নামে শুধু কয়েকটি কম্পিউটার দিয়ে পুরো টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনের নামে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘শাহবাগ বেতার কেন্দ্র’ দখলের অভিযোগ তুলে বলা হয়, শেখ হাসিনা শাহবাগ বেতার কেন্দ্র তার মেয়ে পুতুলের প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনের নামে দখল করে। এর বিপরীতে বেতার সদর দপ্তর নির্মাণের নামে ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে লুটপাট করে। পূর্বে নির্মিত ৬ তলা ভবনের ওপর ৪ তলা ৪৫০ কোটিতে নির্মাণ দেখিয়ে মন্ত্রী, সচিব ও বেতারের কর্মকর্তারা অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

অভিযোগপত্রে জোবাইদুল ইসলাম দাবি করেন, বেতারের ধামরাই ট্রান্সমিটার আধুনিকায়নের নামে ৬৫০ কোটি টাকা তছরুপ হয়েছে, কিন্তু প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়নি। আরও বলা হয় যে, বেতারের মেইনটেইন্যান্সের নামে প্রতিবছর বাজেটে ২০ কোটি টাকা যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য বরাদ্দ রাখা হলেও, সামান্য টাকা খরচ করে বেতারের কর্মকর্তারা বাকি অর্থ আত্মসাৎ করেন।

সুইপার, ঝাড়ুদার ও ড্রাইভারদের ‘অনিয়মিত শিল্পী’ দেখিয়ে মন্ত্রী, সচিব ও কর্মকর্তারা শিল্পীদের সম্মানী খাতের টাকা আত্মসাৎ করেছেন দাবি করে বলা বলা হয়, ‘মাসিক চুক্তিতে প্রায় ৯০০ ব্যক্তি বেতারের টাকা নেয়, যা শিল্পীর সম্মানী খাত থেকে যায়। এই ৯০০ ব্যক্তির মধ্যে সুইপার, ঝাড়ুদার, পিয়ন, দারোয়ান, ড্রাইভারদের অনিয়মিত শিল্পী দেখিয়ে মন্ত্রী, সচিব ও কর্মকর্তাদের বাড়ির কাজের গ্রামের লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা কর্মকর্তাদের নিজস্ব কাজ করে টাকা নেয় বেতার থেকে। উদাহরণ স্বরূপ রাঙ্গামাটিতে মাত্র ৪টি ৫ মিনিটের নিউজ প্রচারের জন্য ৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও ৩২ জনকে অনিয়মিত শিল্পী নামে কর্মকর্তারা চুক্তিতে নিয়োগ দেন। নিয়োগ বাণিজ্যে একেকজনের কাছ থেকে ২-৩ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়। এইভাবে প্রতিটি কেন্দ্রে ৭০ থেকে ৮০ জন চুক্তিভিত্তিক ব্যক্তিকে শিল্পী দেখিয়ে শিল্পীদের সম্মানী লুট করেছেন।’

বেতারের গাড়ি ভাড়ার নামেও ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে—এমনটা উল্লেখ করে অভিযোগকারী বলেন, ‘প্রতিমাসে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ভাড়া দে‌ওয়া হয়, যা একবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ। অথচ মাত্র ১০ থেকে ১২ কোটি টাকায় ৪০টি গাড়ি কেনা সম্ভব, যা বেতারের নিজস্ব সম্পদ হবে।’ আরও উল্লেখ করা হয় যে, বেতারের নিজস্ব গাড়ি না থাকায় প্রায় ৪০ জন ড্রাইভার দুই দশক ধরে বসে বসে বেতন নিচ্ছেন, যার পরিমাণ মাসে প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা।

এ ছাড়া বেতারের গাড়ি শিল্পীদের না দিয়ে কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক ব্যবহার, অনভিজ্ঞদের নিয়ে গঠিত অডিশন বোর্ডে দুর্নীতি, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বদলি ছাড়াই একই কর্মস্থল থেকে অবসরে যাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন জোবাইদুল ইসলাম। অভিযোগপত্রে তিনি বলেন, ‘বেতারে জনবল বাস্তবে ১৬০ জন বিসিএস কর্মকর্তা ও ৩০০ জন কর্মচারী হলেই যথেষ্ট। সেখানে ৬৭৮ জন বিসিএস ‌এবং প্রায় ৪০০ কর্মচারী ও ৯০০ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ‌রয়েছে।’ 

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল। এদিকে, অভিযোগকারী জোবাইদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি বহাল থাকার জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রক্ত দেয়নি ছাত্র-জনতা, আমরা সেই দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার বদল চেয়েছিলাম বলেই তখন হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলাম। সেই অঙ্গীকার থেকেই বেতারে আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আজ তথ্যমন্ত্রী আমার এসব অভিযোগ তদন্ত করার জন্য দায়িত্বশীলদের মৌখিকভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। আশা করছি, বর্তমান সরকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।’