সম্ভাব্য নানা নাশকতা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সারা দেশে পুনরায় অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। গত ১ আগস্ট প্রথম দফার পর শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে দ্বিতীয় দফায় দেওয়া এই জরুরি নির্দেশনায় রাতের টহল, মোবাইল ডিউটি ও চেকপোস্টে দায়িত্বরত সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, সম্ভাব্য বোমা হামলার নির্দিষ্ট খবর পাওয়ার পর বেতার বার্তার (ওয়ারলেস) মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদারের এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সতর্কবার্তা জারির পরপরই রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে তল্লাশি অভিযান ও সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগস্ট মাসকে ঘিরে অন্তত চারটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিকে সামনে রেখে এই বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যে চার কারণে এই বাড়তি সতর্কতা
ডিএমপির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, পুলিশ প্রধানত চারটি বিষয়কে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে। প্রথমত, ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনগুলোর ঝটিকা মিছিল এবং সেখান থেকে যানবাহন বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, আগস্ট মাসকে ঘিরে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) নতুন করে সক্রিয় হতে পারে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে পুলিশের কাছে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলার বিষাদময় স্মৃতি এই আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাড়তি সতর্কতা জারির আরেকটি কারণ হচ্ছে দেশের অভ্যন্তরে বেশ কয়েকটি উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর তৎপরতা। আনসার আল ইসলামসহ অন্যান্য উগ্রপন্থি ও চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য নাশকতামূলক অপতৎপরতা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বা মুখোমুখি সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে ‘তৃতীয় কোনো পক্ষ’ যেন দেশজুড়ে কোনো ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে, সে বিষয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে স্বাভাবিক সময়ে ১১টি স্থায়ী চেকপোস্ট চালু থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে নতুন করে আরও ৫৩টি অস্থায়ী চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। ফলে ঢাকায় মোট চেকপোস্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪টিতে। অন্যদিকে, সারা দেশে আগে থেকে থাকা ৩৩০টি অস্থায়ী চেকপোস্টের পাশাপাশি আরও ১ হাজার ৪৫টি অতিরিক্ত চেকপোস্ট সক্রিয় করা হয়েছে, যার ফলে দেশে মোট চেকপোস্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭৫টি।
একই সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের প্রায় ৮০০টি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় (কেপিআই) নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবন, ইসিবি চত্বর, বিজয় সরণি, গুলশান, বনানী, বারিধারাসহ স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে টহল ও তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। উত্তরার মেট্রোরেল স্টেশন ঘিরেও বাড়তি পুলিশি নজরদারি চোখে পড়ছে।
বিগত ৮ দিনে ঢাকায় গ্রেপ্তার ৩,৫২২ জন
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের অংশ হিসেবে বাড়ানো হয়েছে গ্রেপ্তার অভিযান। ডিএমপি'র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি আগস্টের ১ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত কেবল রাজধানী থেকেই ৩ হাজার ৫২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ আগস্ট ৪৩১ জন, ২ আগস্ট ৪৩১ জন, ৩ আগস্ট ৪১৯ জন, ৪ আগস্ট ৪৫৮ জন, ৫ আগস্ট ৪১৮ জন, ৬ আগস্ট ৪৬৬ জন, ৭ আগস্ট ৪১৪ জন এবং ৮ আগস্ট ৪৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরই মধ্যে বনানীর আর্মি স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় মশাল মিছিল বের করার চেষ্টা করলে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৭ জন এবং গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় গোপন বৈঠকের অভিযোগ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিশেষ করে মিরপুর, উত্তরা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর অঞ্চলে ঝটিকা মিছিলের খবর পাওয়ায় সেখানে মাঠপর্যায়ের নজরদারি দ্বিগুণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের এই নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরির পেছনে শুধুই রাজনৈতিক কর্মসূচি নাকি বড় ধরনের কোনো জঙ্গি নাশকতার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে করা হচ্ছে, এটি পুলিশের নিয়মিত টহল জোরদারের বিষয় নয়, বরং আগস্টের বহুমাত্রিক ঝুঁকি মোকাবিলার একটি সমন্বিত কৌশল।
তবে এই চার ঝুঁকির মধ্যে কোনটি সবচেয়ে বেশি তাৎক্ষণিক ও বাস্তব, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের সুনির্দিষ্ট বস্তুনিষ্ঠতা নিয়েও জনমনে কৌতুহল তৈরি হয়েছে।