আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখা ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (একিউআইএস) বাংলাদেশে নিজেদের সেল বা ক্ষুদ্র সাংগঠনিক ইউনিট গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিম’-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হয়।
জাতিসংঘের মনিটরিং টিমের প্রতিবেদনে বলা হয়, একিউআইএস এখন আর কেবল একটি খণ্ডিত গোষ্ঠী নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হচ্ছে। বড় কোনো একক ইউনিট তৈরি না করে তারা নিজেদের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে বিকেন্দ্রীভূত ছোট দল বা ‘সেল’ গঠন করছে। একই সঙ্গে নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশকে ব্যবহারের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এখানে নতুন সেল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সংগঠনটি বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে লজিস্টিকস এবং আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। একিউআইএস-এর সহিংস কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রতিবেদনে গত বছরের ২৫ নভেম্বর ভারতের দিল্লির লাল কেল্লায় সংঘটিত প্রাণঘাতী গাড়ি বোমা হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ভয়াবহ ওই হামলায় ১১ জন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।
পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) চলতি বছরের মে মাসে ১০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেয়। তদন্তকারীদের মতে, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন উমর উন-নবী, যিনি ফরিদাবাদের আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন এবং হামলায় নিহত হন। হামলাটি একিউআইএস-এর অনুসারী গোষ্ঠী ‘আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ’ পরিচালনা করেছিল।
এছাড়া, প্রতিবেদনটিতে চরম উদ্বেগজনক আরও একটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। আর তা হচ্ছে, আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো গোষ্ঠীগুলো এখন রাসায়নিক ও জৈবঅস্ত্র তৈরির দিকে ঝুঁকছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে তারা সদস্যদের রাসায়নিক বিষ ও জৈব উপাদান তৈরির নির্দেশ দেয়। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ভারতে এক চিকিৎসকসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা ‘রিসিন’ নামের একটি মারাত্মক বিষ তৈরির চেষ্টা করছিল।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, একিউআইএস-এর শীর্ষ নেতারা বর্তমানে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে অবস্থান করছেন। তাদের আফগান জাতীয় পরিচয়পত্র বা ‘তাজকিরা’ প্রদান করা হয়েছে, যা আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকারের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়া পাকিস্তানে সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘ইত্তিহাদ-উল-মুজাহিদিন পাকিস্তান’ (আইএমপি)-এর মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে একিউআইএস। গত ৯ মে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার বান্নুতে একটি নিরাপত্তা চৌকিতে আত্মঘাতী গাড়ি বোমা হামলায় ২১ জন নিহত হন, যার পেছনে এই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে জাতিসংঘের সংস্থাটি জানায়, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে ক্রমাগত হামলা ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। যদিও তালেবান সরকার প্রকাশ্যে কোনো সন্ত্রাসী দলকে আশ্রয় দেওয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে, তবে তাদের তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও একিউআইএস-কে দেওয়া পরোক্ষ সমর্থন এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।