জাতীয় সংসদ সদস্যদের একের পর এক নৈতিক স্খলনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কিশোরী মরিয়ম খাতুনকে যৌন ব্ল্যাকমেইল (সেক্সটরশন), ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরবর্তীতে মরিয়মের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার পরও সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
আজ মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি মরিয়মের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের জন্য অবিলম্বে বাধ্যতামূলক 'নৈতিক আচরণবিধি' প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, তাকে সংসদে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন এবং তার বাবাকে ঠিকাদারি লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে এমপি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে তিনি মরিয়মকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন। দলীয় তদন্তে 'নৈতিক স্খলন' প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকেন। সম্প্রতি মরিয়মের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় এই সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
এমপি নজরুলের সংসদীয় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। তাই বলে, দলের বিপক্ষে ভোট না দেওয়ার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব না হলেও সংসদ ও অন্যান্য সংসদ সদস্যদের জন্য মর্যাদাহানিকর এমন অবস্থার জন্য দায়ী ব্যক্তির সংসদ সদস্য পদ অব্যাহত থাকবে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।'
তিনি আরও জানান, আদালত ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করবে, কিন্তু সংসদ সদস্যের নৈতিকতা, ক্ষমতার ব্যবহার ও জনগণের আস্থার প্রশ্নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদের। তাই তাঁর সংসদীয় পদ বহাল রাখার বিষয়ে জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানান তিনি।
সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড হলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়। আইনগত এই সীমারেখাকে ক্ষমতার অপব্যবহারের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার না করে গুরুতর নৈতিক স্খলন ও সংসদ-অবমাননাকর আচরণের ক্ষেত্রে পদ বাতিলের সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করার দাবি জানায় টিআইবি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, সংসদ সদস্যদের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি গণমাধ্যমে বারবার উঠে আসলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ২০১০ সালে টিআইবির খসড়ার ভিত্তিতে 'দ্য মেম্বারস অব পার্লামেন্ট কনডাক্ট বিল' সংসদে উত্থাপিত হলেও তা আইনে পরিণত হয়নি।
পরবর্তীতে ২০২৪-পরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এবং দুদক সংস্কার কমিশনও সংসদ সদস্যদের জন্য পৃথক আচরণবিধি এবং বাৎসরিক সম্পদ বিবরণী প্রকাশের জোর সুপারিশ করেছে, যাতে রাজনৈতিক দলগুলোও ঐকমত্য পোষণ করেছে।
জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সমস্যা ও সমাধানের পথ জানা থাকা সত্ত্বেও আইন প্রণয়নে কেন বিলম্ব করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অবিলম্বে সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক আচরণবিধি প্রণয়ন এবং একটি 'এথিক্স কমিটি' গঠনের জোর দাবি জানিয়েছে টিআইবি।