ভিক্ষুক কখন ভিক্ষা নেয় না?

নব্বইয়ের দশকে একটা গান খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। গানের কথা ছিল এমন, ‘একটা ট্যাকা দিয়া যান, আমি গরিব ইনসান’। গানের দৃশ্যটা ছিল এমন, বাবা–মেয়ে ঢাকায় ভিক্ষা করেন এবং ভিক্ষার টাকায় তারা বেশ বিলাসী জীবনযাপন করেন। ফাইভ স্টার হোটেল খাওয়া–দাওয়া, ড্যান্স পার্টিতে নাচা-গানা - কী নেই!

গানের দৃশ্যায়নে দেখা যায়, বাবা একজন সাধারণ ভিক্ষুক। যে যা দেয়, উনি তাই নেন। কিন্তু মেয়ে তো নতুন যুগের। তাই সামান্য চার আনা বা আট আনা ভিক্ষায় তার পোষায় না। এমনকি এয়ারপোর্টে ভিক্ষা করার সময় কেউ এক–দুই টাকা দিলেও ছুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করেনা। তার দাবি, এয়ারপোর্টে ভিক্ষা দিতে হবে ডলারে!

ভিক্ষার সময় মেয়ের এমন উদ্ধত আচরণ যে ভালো না, তা বুঝতে পেরেছিলেন অভিজ্ঞ বাবা। কিন্তু নতুন প্রজন্ম কী আর বাবার কথা শোনে! শেষমেষ মেয়ের প্রতি অসহায় বাবার অমোঘ উচ্চারণ, ‘এতো দেমাগ দেখাস না মাগো…’! অর্থাৎ, ভিক্ষার ঝুলি নিয়েই যখন নামা হবে, তখন এতো ভাব নেওয়ার কিছু নেই।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতার দরকষাকষি চলার মধ্যে গত ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইনে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। সেখানে বলা হয়, ‘জি এম কাদের কার্যালয়ে (বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়) ঢোকার পরপরই গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। এ সময় জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক তাঁকে একটু দাঁড়িয়ে কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন। এ সময় জি এম কাদের বলেন, ‘ভিক্ষার সিট আমি নেব না।’ এ কথা বলে তিনি তাঁর কক্ষে চলে যান।’

অথচ তখন জাতীয় পার্টি প্রথমে ৫০ আসনে, পরে ৪২ এবং তারও পরে ৩৫ আসন চেয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ২৬টি আসনে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়। ২৬ সংখ্যাটাই কি তবে জাতীয় পার্টির কাছে ভিক্ষা মনে হয়েছে? যদিও দলটিকে শেষ পর্যন্ত তাতেই রাজি হতে হয়েছে।  

জাতীয় পার্টি যে আসন ভিক্ষা করছে, এটা কিন্তু বাইরের কেউ বলেনি। দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের নিজেই বলেছেন। এতোদিন জাতীয় পার্টির এই আসন সমঝোতাকে ‘বানরের পিঠা ভাগাভাগির’ সঙ্গে তুলনা করে এসেছে বিএনপি। এবার জাতীয় পার্টির ভেতর থেকেই উঠল ভিক্ষার প্রসঙ্গ।  

জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো দল নয়। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সেনাশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ দলটিকে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও এনেছিলেন। এরশাদের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জি এম কাদের দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। দলটি আসলে কখন কী করবে, তা নিয়ে সবার মধ্যেই ধোঁয়াশা আছে। অনেকেই মনে করেন, ক্ষমতাসীনদের লেজুড়বৃত্তি করা ছাড়া জাতীয় পার্টির কোনো উপায় নেই। দলটি ক্রমাগত সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর তুমুল বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় পার্টি কারও সহযোগিতা ছাড়াই ৩৫টি আসনে জয়লাভ করে। ২০০১ সাল পর্যন্ত দলটির এক ধরনের স্বকীয়তা ছিল। এমনকি ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হয়ে নির্বাচনে প্রায় বিএনপির সমান আসনে জয়লাভ করে জাতীয় পার্টি। ওই বার তারা অল্পের জন্য জাতীয় সংসদের বিরোধী দল হতে না পারলেও, রাজনীতিতে জাতীয় পার্টি যে একটা ফ্যাক্টর, তা জানিয়ে দিয়েছিল।

ফাইল ছবি

মূলত এর পর থেকেই জাতীয় পার্টি স্বকীয়তা হারাতে থাকে। নিজের ক্ষমতায় দলটির নির্বাচনে জেতা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নিন্দুকেরা বলেন, ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের কারণে দলটি ৩৪টি আসনে জয় পায়। একই অবস্থা হয় ২০১৮ সালের নির্বাচনেও। সেবার দলটি আওয়ামী লীগের ছেড়ে দেওয়া ২২টি আসনে জয় পেয়ে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করে।

অবস্থা হয়েছে এমন - সংগঠন না গুছিয়ে জাতীয় পার্টি এখন আওয়ামী লীগ কতটি আসনে জয় পাইয়ে দেবে, তাই নিয়ে আলোচনায় থাকে। পরিস্থিতি অনেকটা - 'জয় পাচ্ছি, স্ট্যাটাসও পাচ্ছি, তাহলে কষ্ট করে লাভ কি?'

প্রসঙ্গক্রমে একটু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ঢোকা যাক। ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, তাদের মিলও খুঁজে পাবেন নিশ্চয়ই। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক নারী ভিক্ষা করতেন। ছোটখাটো গড়নের ওই নারীর বয়স বোঝার উপায় ছিল না। মূলত দৈহিক গড়নের কারণেই তিনি ভিক্ষা পেতেন। চলাফেরা–কথাবার্তায় কোনো সমস্যা ছিল না। এই নারী দিনের শুরুর ভাগে কলাভবন, বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, হাকিম চত্ত্বর ও মল চত্ত্বরে ভিক্ষা করতেন। বিকেলে দেখা যেত টিএসসি, রোকেয়া হল ও শামসুন্নাহার হল এলাকায়।

ওই নারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির উল্টো পাশে বেলালের সুপরিচিত চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বাসায় কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন একজন নারী। সেখানে চা পানের সূত্রে ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু। মনে আছে, ওই নারীর প্রস্তাবে ছিল মাসে চার হাজার টাকা করে বেতন দেওয়ার প্রস্তাব। এর বাইরে থাকা–খাওয়া, কাপড়চোপড় কিনে দেওয়া এবং বাদবাকি যা যা লাগে, সবকিছু দেওয়ারও প্রস্তাব ছিল। ২০০৪–২০০৫ সালের দিকে এই প্রস্তাব বেশ লোভনীয়ই ছিল বলা চলে। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে প্রত্যুত্তর এসেছিল যে, ভিক্ষা করেই দিনে যেখানে মেলে ৫০০–৬০০ টাকা, সেখানে তিনি বাসায় কেন এতো অল্প বেতনে কাজ করবেন!

এখন প্রশ্ন হলো - জি এম কাদের যদি ভিক্ষা করেই মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা বিরোধীদলীয় নেতা হতে পারেন, স্ত্রীকে সংসদ সদস্য বানাতে পারেন, তাহলে কষ্ট করে দল গোছানো বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনে জিতে আসার আর কী দরকার?   

লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন