হৃদয়হীনেরা অন্যের হৃদয় ঠিক রাখবেন কীভাবে!

দেশের মানুষের উপকারের কথা ভেবে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। মূলত সাধারণের কল্যাণ নিশ্চিতের হিসাব করেই সেসব কাজ করতে হয়। নইলে শুধুই মুনাফা অর্জনের দুনিয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এসব ক্ষেত্রে হিসাব কষতে হয় সবদিক চিন্তা করে, যাতে আর সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে না হয়। আবার কেউ যেন অযথা দোষ চাপাতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখতে হয়।

কিন্তু যখন আপনি একটি ভালো সিদ্ধান্তও প্রশ্ন তোলার অবকাশ রেখে করবেন, তখন সৃষ্টি হয় অহেতুক গন্ডগোল। আর সেই সুযোগে পা রাখা হয় সাধারণ মানুষের গলায়। জিম্মি করা হয় তাদেরই, যাদের আসলে সুফল ভোগ করার কথা!

ঠিক এমন চিত্রই এবার দেখা গেছে দেশে হার্টের রিংয়ের মূল্য নির্ধারণকে কেন্দ্র করে। হুলুস্থুল চলছে বিষয়টি নিয়ে। মূল্য নির্ধারণের পর আমদানিকারকেরা পুরোপুরি নাখোশ। এতটাই যে তাঁদের একটি বড় অংশ ধর্মঘট ডেকে রিং সরবরাহই বন্ধ করে দিয়েছেন। উঠেছে বৈষম্যের অভিযোগ। অনুচ্চারে শোনা যাচ্ছে, এক পক্ষকে আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ফিসফাস। অন্যদিকে মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রকারান্তরে বলছে, বর্তমান সংকটে করার তেমন কিছু নেই। এই ঝগড়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু দুই পক্ষেরই বক্তব্য শুনলে মনে হবে, সেসব নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। একপক্ষ তো সাধারণ রোগীদের এই ধর্মঘটকালে একাত্ম হতে হার্টে রিং না পরারই অনুরোধ করে বসেছে। আর নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের সেই পুরোনো সুর—সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হওয়ার নাকি কোনো কারণই নেই! যদিও শাঁখের করাতে যারা পড়েছে, কেবল তারাই বুঝছে যন্ত্রণা আসলে কতটা।

সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গত ১৬ ডিসেম্বর হার্টের রিংয়ের নতুন মূল্য ঠিক করে দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এর প্রতিবাদে ২৭টির মধ্যে ২৪ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রিং সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। জানা গেছে, হার্টের রিংয়ের আকার ও বেশি দামের কারণে হাসপাতাল থেকে ফিরে যাচ্ছে অনেক রোগী। ১৭ ডিসেম্বর থেকে চলছে এমন দুর্ভোগ। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা বলছেন, তুলনামূলক কম দামের কারণে ইউরোপের রিংয়ের চাহিদা বেশি। কিন্তু সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনেক রোগীকে ফিরে যেতে হচ্ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জে. নাজমুল হকও স্বীকার করে নিয়েছেন যে, চলমান পরিস্থিতিতে হার্টের রিং নিয়ে অবশ্যই ভোগান্তি আছে।

এই ‘অবশ্যই’ শব্দটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিবদমান দুই পক্ষই ভোগান্তিকে উপেক্ষা করে যার যার অবস্থানে অনঢ় হয়ে আছে। আলোচনা হলেও সুরাহা হচ্ছে না। মাঝখানে ঝামেলায় পড়েছেন সাধারণ রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে এমনও দাবি করা হয়েছে যে, রিং না পেয়ে অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকেও নাকি ফিরে যেতে হচ্ছে রোগীদের! অসহায়ত্বের মাত্রাটা বুঝুন।

হার্টের রিংয়ের মূল্য নির্ধারণের প্রশ্নটি ওঠেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশে রিংয়ের আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণে। বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী একটি বিষয় স্পষ্ট যে, পাশের দেশ ভারত বা নেপালের তুলনায় বাংলাদেশে রিংয়ের মূল্য বহুগুণ বেশি ছিল এতদিন। ফলে অনেক রোগীই কম খরচে ভারতে চিকিৎসা করাতে যেত। এবার সেটিই সমান করার উদ্দেশ্য ছিল। শুরুতেই যেটা বলেছিলাম যে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে সঠিক থাকার একটি বাধ্যবাধকতা থেকে যায়। তবে আমদানিকারকদের অভিযোগের ফিরিস্তি দেখে অন্তত এতটুকু বোঝা যায় যে, মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক আলোচনা কিছুটা হলেও কম হয়েছে। প্রশ্ন হলো, জীবনরক্ষাকারী একটি উপাদানের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো সংস্থার প্রক্রিয়াগত ফাঁকফোকর রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত কি না। আর সেটি নেওয়া হলেও, সম্ভাব্য বিপরীত প্রক্রিয়ার কুপ্রভাব সম্পর্কে বিবেচনা এবং সেটি সামাল দেওয়ার জন্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা করা হয়েছিল কি না।

সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে এটুকু বোঝাই যাচ্ছে যে, এসব ফাঁকফোকর ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে চিন্তাভাবনা খুব একটা হয়নি। আর অন্যদিকে যারা ধর্মঘট ডেকেছেন, তারা তো ভাবছেনই না। সাধারণ মানুষের গলায় ফাঁস আটকে দুই পক্ষের দড়ি টানাটানির এমন ঘটনা অবশ্য এ দেশে নতুন নয়। প্রায়শই আমাদের দেশের কিছু মানুষ এভাবেই গণের টুঁটি চেপে দাবি ছিনতাই করেন। আর নিয়ন্ত্রকেরা গণের উপকারের কথা মুখে বলে এমনভাবেই কাজটি করেন, যাতে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি হয়! তবে এই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই ফাঁসে আটকে হাঁসফাঁস করতে থাকা গণমানুষের করুণ মুখটি বিক্রি করে কারও না কারও লাভ হয়। কারণ পুঁজির পূজারি এই দুনিয়ায় সংকট সব সময়ই মুনাফার সুযোগ তৈরি করে। আর গণের জীবন তো বরাবরই খরচযোগ্য!

অথচ একটু বুঝেশুনে এগোলেই এই পৃথিবীর অনেক সংকট সৃষ্টিই হতো না। কিন্তু একটি বৃহৎ অংশের মানুষকে বিপদে না ফেললে যেহেতু কিছু লোকের উদরপূর্তি হয় না, তাই সংকট সৃষ্টি করা হয়। এবং সেটিকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা চলে। এখন যেমন বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে হার্টের রিংয়ের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে এই উদ্ভূত সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। মানুষের জীবনরক্ষাকারী পণ্যের মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কী সম্পর্ক—সেটি বোঝা সাধারণের পক্ষে আসলেই কঠিন। এই নির্বাচন, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন বা সরকার গঠন—সবই করা হয় সাধারণ মানুষের ভালোর কথা বলেই। তো উপযুক্ত সিদ্ধান্তের অভাবে তাদের হৃদযন্ত্রই যদি বিকল হয়ে পড়ে থাকে এবং সে কারণে তারা মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছেই যান, তবে আর কী লাভ হবে?

এই দেশের প্রেক্ষাপটে এমন প্রশ্ন খুঁজলে মিলবে ঢের। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখন একটু নড়াচড়া করলেই হয়। তাহলে হয়তো একদল মানুষের তৈরি কৃত্রিম সংকটে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যাওয়া রোগীদের অসহায় স্বজনদের চোখের জলে দিশেহারা হতে হবে না।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন