প্রতিটা বাস্তুসংস্থানে একটি খাদ্যচক্র থাকে। তাতে নিচের স্তরে থাকা প্রাণি সব সময় উচ্চ স্তরে থাকা প্রাণির খাবারে পরিণত হয়। অর্থাৎ, খাদক ও খাদ্যের একটি সম্পর্ক বেশ শক্তভাবেই থাকে। সাধারণত খিদে মেটানোর জন্যই বা বেঁচে থাকার স্বার্থেই এই সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই সম্পর্ক কিছুটা কি বদলে গেছে? তাই কি একই শ্রেণিভুক্ত প্রাণি হয়েও এক মানুষ অন্যকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
সম্প্রতি দেশে পরপর দুটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটল। এর মধ্যে একজন দেশের খ্যাতনামা শিল্পী সাদি মহম্মদ। গত ১৩ মার্চ তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ঘরের দরজা ভেঙে তাঁর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেন পরিবারের সদস্যরা। মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়েছিলেন এই বরেণ্য শিল্পী। ছিল নানামাত্রিক অভিমানও।
এই অভিমানের প্রসঙ্গে সাদি মহম্মদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া–না পাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিল্পীর আক্ষেপ থাকার কথাও শোনা গেছে পরিবারসূত্রেই। তবে হ্যাঁ, এটি মানতেই হবে যে, শুধু পদক বা স্বীকৃতির প্রশ্নে সাদি মহম্মদের মতো এমন মহৎপ্রাণ একজন শিল্পী মৃত্যুর দুয়ারে হেঁটে যেতে পারেন না। তাই এ ধরনের কথা যারাই বলাবলি করছেন, অন্তত শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের স্বার্থেই সেটি বন্ধ করা উচিত।
এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বলে নেওয়া ভালো যে, আত্মহত্যা কখনোই আপনাকে চূড়ান্ত কোনো সমাধান দেবে না। যে জীবনে ক্লিষ্টবোধ করে কেউ সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, এর বদলে চাইলে সেটিকে পরিবর্তনের দায়িত্বও নেওয়া যায়। হয়তো তাতে সব ঠিক হয়ে যাবে না, কিন্তু কেউ না কেউ ওই পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়াতেই উপকৃত হতেও পারে। সব ক্রিয়ারই তো প্রতিক্রিয়া থাকে, তাই না?
তাহলে সমাধান নেই জেনেও কেন মানুষ অসীম শূন্যতার পথে পা বাড়ায়? এর প্রধান কারণ হলো মানুষের বিষাদগ্রস্ততা। এটি কোনো হাতি-ঘোড়ার কারণে সৃষ্টি হয় না। এর জন্য দায়ী অন্য মানুষই। তারাই একজন মানুষকে ধীরে ধীরে খাদের কিনারে ঠেলে দেয়। আর ঠেলা খেতে খেতে একটা সময় ওই মানুষটা টুপ করে পড়ে যায় খাদে। মনটাই আগে মরে যায় দেখে সে আর লড়াই করার সাহস পায় না। পায় না ঘুরে দাঁড়ানোর মতো মনের জোর। এক মানুষের ভেতরে এই ভঙ্গুরতা তৈরি করায় অবদান রাখে আরেক মানুষই, একদল মানুষ বা সমাজই। ছকে বাঁধা সমাজ নির্দিষ্ট ছকের বাইরে কাউকে দেখলেই এককোণে নিয়ে ফেলতে চায়। আর এভাবেই একটা মানুষ মরে যায়। সাধ করে কেউ নিজেকে মারে না। মৃত্যুর দিকে হেঁটে যাওয়া কখনোই তো শখ হতে পারে না, তাই না?
সাদি মহম্মদের মতো একজন শিল্পীর ক্ষেত্রেই আমরা সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছি। তাঁর পাশে দাঁড়াতে পারিনি। তাঁর বিষাদের ভুবনে ভালোবাসার ঢেউ জাগাতে পারিনি। এভাবে আমরাই কি ওনাকে খাদের কিনারে ঠেলে দেইনি? সাদি মহম্মদের পাহাড়প্রমাণ অভিমানে তাই আমাদেরও দায় আছে। সেই দায় এই অসহিষ্ণু ও অসহনশীল সমাজ অস্বীকার করতে পারে না।
একইভাবে সাম্প্রতিক দ্বিতীয় আত্মহত্যার ঘটনাতেও আমাদের দায় প্রবল। সংবাদমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, গত শুক্রবার রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্রী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা কুমিল্লায় নিজের বাসায় আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে ফাইরুজ তাঁর এক সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ এনে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। তাতে অবন্তিকা অভিযোগ করেন, তাঁর সহপাঠী আম্মান তাঁকে অফলাইন ও অনলাইনে বিভিন্ন সময় হুমকি দিতেন। এ ব্যাপারে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি। উল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম তাঁকে নানাভাবে বহিষ্কারের ভয় দেখান। ওদিকে অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনমের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বারবার জানিয়েও হয়রানির বিচার পাননি তাঁরা। এ কারণেই তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
এরই মধ্যে এ ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত দুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। পুলিশ ওই দুজনকে আটক করেছে এবং আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘খণ্ডিত সংশ্লিষ্টতা’ পাওয়ার তথ্য জানিয়েছে। অর্থাৎ, প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে। যদিও সারা দেশের অনেকেই আজ এই বলে বিভক্ত যে, অবন্তিকাই আসল দোষী কিনা! অভিযুক্তরা দাবি করছেন যে, তাঁরা কিছুই করেননি। সেটি তাঁদের অধিকারও, তাঁরা করতেই পারেন। তবে আমাদের এটিও বুঝতে হবে যে, কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্যই একজন আত্মহননের পথে যায় না। একবার নিজের ক্ষেত্রে চিন্তা করেই দেখুন না! পারবেন না। এর পেছনে থাকতে হয় বহুমাত্রিক কারণ। আমাদের সমাজের মানুষের বর্তমান বিভক্তি ও মনোভাব দেখে অনুভব করার চেষ্টা করলেই বুঝবেন, অবন্তিকাকেও আসলে খাদের কিনারেই ঠেলে দিয়েছিল কতিপয় মনুষ্য সন্তান। তা এমনই এক নিকশ কালো আঁধার যে, কিছুদিন আগে আত্মহত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা মানুষটিও সেই একই কাজ করে বসেছেন।
এসব দেখলে বারবারই মনে হয় একটি ইংরেজি শব্দ। সেটি হলো–‘কানিবালিজম’। এই বিষয়টি নিয়ে মানবকূল দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চালাচ্ছে। ইতিহাসের বিভিন্ন প্রান্তে একজন মানুষের আরেকজনকে খেয়ে ফেলার গল্প ছড়িয়ে আছে। আছে নানা কাহিনি। বর্তমান বাস্তবতায় এমন মনে হতেই পারে যে, আমাদের সমাজেও এই কানিবালিজম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আমরা কেবল গায়ে ছুরি চালিয়ে সেটি আক্ষরিকভাবে বাস্তবায়ন করি না, এই আর কি! একজন মানুষের মনকে কেটে টুকরো টুকরো করে জীবন্মৃত করে ফেলাটায় বরং এ সমাজের মানুষদের দক্ষতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। নইলে একটি সমাজ এতটা অসহনশীল, এতটা অসহিষ্ণু বা এতটা কটু মন্তব্যে পরিপূর্ণ হয় কীভাবে?
ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আসলে ধন্ধে পড়ে যেতে হয় যে, কোনটি আসলে আত্মহত্যা, আর কোনটিই বা হত্যা? অবন্তিকার লেখা শেষ স্ট্যাটাসের ভাষায় বলতে গেলে বাক্যগঠন দাঁড়ায় এমনই–‘…এটা সুইসাইড না এটা মার্ডার। টেকনিক্যালি মার্ডার।’
আচ্ছা, তবে কি আমরা অন্যকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়ে নিজে বেঁচে থাকতে চাইছি? চলুন, উত্তরটা নিজেই একটু খুঁজি।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন