নির্বাচনী বন্ড

টাকা ঢোকে মোদি–মমতার পকেটে, মাশুল জনগণের

নির্বাচনী বন্ড নিয়ে তুলকামাল চলছে ভারতে। আর চলাটাই স্বাভাবিক। যেখানে ‘রাজনীতি’ আর ‘দুর্নীতি’ সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে ভোটের আগে আগে নির্বাচনী বন্ডের মতো ঘুষ–চাঁদাবাজি নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় ওঠা বিচিত্র কিছু নয়।

নির্বাচনী বন্ড নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো যেসব খবর প্রকাশ করছে, তা শিউরে ওঠার মতো। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসাবমতে, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও তাদের মালিকদের কাছ থেকে ১২ হাজার ৭৬৯ কোটি রুপি চাঁদা নিয়েছে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো। বলাই বাহুল্য, এই চাঁদাগুলো নিয়েছে নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে এবং স্বাভাবিকভাবে বেশির ভাগ চাঁদা নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

দ্য হিন্দু স্পষ্টভাবেই বলেছে, নির্বাচনী বন্ডের ৬ হাজার ৬০ কোটি রুপি ঢুকেছে মোদি তথা বিজেপির পকেটে। আর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস তথা মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেস।

ঘুষ–দুর্নীতি যেন ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে রাজতিলকের মতো সেঁটে গেছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো কতভাবে যে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছে, তা গুনে শেষ করা যাবে না। আর প্রতিটি দুর্নীতি–কেলেঙ্কারিতেই লাভবান হয়েছে রাজনৈতিক দল ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বড় বড় শিল্পপতি–ব্যবসায়ীরা। বিপরীতে, মাশুল গুনেছে সাধারণ মানুষ।

কিন্তু এবারের নির্বাচনী বন্ড–কেলেঙ্কারি অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। এত বিপুল আয়তনের দুর্নীতি ভারতবাসী এর আগে প্রত্যক্ষ করেনি। তাই দুর্নীতিজনিত দুর্ভোগও এখন বেশি ভোগ করতে হচ্ছে ভারতবাসীকে। যেমন—বিদ্যুতের দাম, ওষুদের দাম থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের দাম পর্যন্ত সবক্ষেত্রে বিপুল মাশুল গুণতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

দ্য হিন্দু এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিদ্যুৎখাতের মাফিয়া সঞ্জীব গোয়েঙ্কা বিদ্যুৎ নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করে যাচ্ছেন। আর এ জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে দিয়েছেন ৪৪৪ কোটি রুটি চাঁদা। সঞ্জীব গোয়েঙ্কা তাঁর সিইএসসি ও অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই টাকা দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসকে। এর মধ্যে হলদিয়া এনার্জির মাধ্যমে দিয়েছেন ২৮১ কোটি রুপি, ধারিওয়াল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে দিয়েছেন ৯০ কোটি, পিসিবিএলের মাধ্যমে ৪০ কোটি এবং ক্রিসেন্ট পাওয়ারের মাধ্যমে দিয়েছেন ৩৩ কোটি রুপি।

এর ফল কী হয়েছে? গোয়েঙ্কা কোম্পানির এই উপঢৌকনের দায় মেটাতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ১৪ বার বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়েছে। দ্য কুইন্ট নামের সংসবাদমাধ্যম বলছে, কয়লার দাম যখন অর্ধেকে নেমে এসেছিল, তখনও বিদ্যুতের দাম এক পয়সাও কমায়নি মমতা ব্যানার্জির সরকার। অর্থাৎ সিইএসসি যে শাসক দলকে কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছে, তা তুলে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে। 

তারপর ওষুধের দিকে তাকানো যেতে পারে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, নির্বাচনী বন্ডের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ওষুধ শিল্পে। রাতারাতি ওষুধের দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। একই সঙ্গে ওষুধের মানও কমে গেছে ভয়ানকভাবে।

সংবাদমাধ্যমটির দেওয়া তথ্যমতে, ভারতের ৩৫টি ওষুধ কোম্পানি নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে ১ হাজার কোটি রুপিরও বেশি চাঁদা দিয়েছে। এই চাঁদার টাকা ওঠাতেই তারা ওষুদের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

দ্য হিন্দু বলছে, ভারতে অন্তত ৮০০টি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের দাম বেড়েছে। ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে, ওষুধের গুণগত মানের পরীক্ষায় ফেল করা সাতটি ওষুধ কোম্পানি ক্ষমতাসীন দলকে ঘুষ দিয়ে ছাড়পত্র নিয়েছে। ওই সব কোম্পানির মানহীন ওষুধ দেদারছে বিক্রি হচ্ছে ভারতের বাজারে। ফলে রোগ তো সারছেই না, উল্টো নানাবিধ নতুন রোগে জড়িয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এ যেন সাধারণ মানুষের প্রাণ নিয়ে ভোটবাজ রাজনৈতিক দলগুলোর ‘যা খুশি তাই’ উৎসব!

সাধারণ মানুষকে নিয়ে ব্যবসা করার আরেক বিকট উদাহরণ হয়ে উঠেছে ভারতের লটারি ব্যবসার রাজাধিরাজ ‘ফিউচার গেমিং’ কোম্পানি। এই সংস্থা নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে তৃণমূল সরকারকে দিয়েছে সবচেয়ে বেশি চাঁদা। আর তার বিনিময়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ব্যবসা করার অবাধ লাইসেন্স। এর প্রমাণ দেখা যায় লটারির দোকানগুলোতে। শত শত গরিব শ্রমজীবী মানুষের উপচে পড়া ভিড় সেখানে। একটু ভালোভাবে জীবন কাটানোর প্রলোভনে তারা তাদের উপার্জনের সর্বস্ব ব্যয় করছে লটারির পেছনে। জনস্বার্থ নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ থাকলে সরকার বহু আগেই এসব অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করত। কিন্তু কোটি কোটি ঘুষের টাকা তো আগেই ঢুকেছে মমতার পকেটে, এখন সাধারণ মানুষের পকেট কাটলেই বা কী এসে যায়!

রাজনৈতিক দলগুলোকে এভাবে ঘুষ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আরও বহু নজির দেখা যাচ্ছে মোদিজির ভারতে। হিন্দুস্তান টাইমসের মতে, ৩৮টি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী বন্ডে বিজেপিকে ঘুষ দিয়ে ১৭৯টি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এসব কোম্পানির বেশির ভাগই ‘অযোগ্য’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

প্রতিষ্ঠানগুলো যে অযোগ্য, তার প্রমাণ—কিছু দিন আগে উত্তরাখণ্ডের সিল্কিয়ারায় একটি নির্মীয়মান সেতু ধসে পড়ে ৪১ জন শ্রমিক ১৬ দিন ধরে আটকা ছিল। সেতুটি নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে নবযুগ ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি অখ্যাত কোম্পানি। দুর্ঘটনার তদন্তকারীরা বলছেন, নিরাপত্তাকে কোনও তোয়াক্কাই করেনি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। নেবেই বা কী করে? আগে থেকে ঘুষ খেয়ে মুখে কুলুপ! ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, ২০১৯ থেকে ২০২২-এর মধ্যে নবযুগ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি নির্বাচনী বন্ডে ৫৫ কোটি রুপি দিয়েছে বিজেপিকে।

আর মাত্র দুদিন পর থেকেই ভারতে শুরু হচ্ছে লোকসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে চোখ ধাঁধানো প্রচারণায় মেতে উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলো। ব্যানারে ফ্লেক্সে বড় বড় হোর্ডিং-কাট আউটে ভরে উঠেছে ভারতের অলিগলি। ভোটারদের হাতে হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দামি দামি উপঢৌকন। ফেসবুকে লাখ লাখ রুপি ব্যয় করে চালানো হচ্ছে ‘পেইড’ প্রচারণা।

এত বিপুল ব্যয়ের উৎস আসলে কোথায়? নিঃসন্দেহে নির্বাচনী বন্ড। নির্বাচনী বন্ডের টাকায় ব্যাপক প্রচার চালিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দলগুলো। আর এইসব প্রচারের ঝলকানির নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিদিনের দীর্ঘশ্বাস।

যাঁর ঘটে সামান্য বুদ্ধি আছে, তিনিও বুঝবেন, নির্বাচনী বন্ডের অর্থ শুধু নির্বাচনী প্রচারেই ব্যয় হবে না, বরং ভোট জাল করতে, নির্বাচনী বুথ দখল করতে, এলাকার বখাটে ছেলেদেরকে মদ খাওয়ার টাকা দিয়ে নানা বেআইনি কাজ (যেমন সন্ত্রাসী পরিবেশ তৈরি) করতে ব্যয় করা হবে।

তাই নির্বাচনী বন্ড সত্যিই এক উদ্বেগের নাম।

লেখক: সহ–সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন