নিহত, আহত, ধ্বংস: থামতে তো হবে

সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক মাধ্যম সব জায়গাতে হতাহতের খবর। একটা-দুটো মৃত্যু না। সরকার বলছে শ দেড়েক মানুষ মারা গেছে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের হিসেবে দুই শর বেশি মানুষ মারা গেছে। সামাজিক মাধ্যমে ও জনশ্রুতিতে এই সংখ্যা আরও বেশি। কয়েক হাজার মানুষ আহত। ঢাকাতেই আহতের সংখ্যা বেশি। আহতদের কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন, যা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। সব মিলে কঠিন পরিস্থিতি।

মোটামুটি নিস্তরঙ্গ একটা সময়ে হঠাৎ কেন এমন হলো? এত এত জীবন আর সম্পদের ক্ষতি কেন এড়ানো গেল না? জীবন ও সম্পদের আরও ক্ষতি এড়াতে কী করা যেতে পারে–এটাই এখন ভাবনার বিষয়।

আন্দোলন ও তার বিষয় নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য থাকতে পারে। কোটা ব্যবস্থা, সেটির ইতিহাস, ভালো দিক, মন্দ দিক–এসব নিয়ে কথাবার্তা, মতের ভিন্নতা এ লেখার বিষয়বস্তু নয়। বরং এই লেখায় দেখার চেষ্টা করা হয়েছে একটি আন্দোলন কীভাবে ছোট থেকে বড় হয়েছে; শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি থেকে চরম সহিংস পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছে। এসবই ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে।

গত ছয় বছর ধরে সরকারি চাকরির নবম থেকে ত্রয়োদশ গ্রেডে নিয়োগে কোনো কোটা ছিল না। ২০১৮ সালের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সকল কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সেই পরিপত্র নাকচ করে দিলে এবারের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত। আঠারো সালের আগের কোটা ব্যবস্থা, যেখানে অর্ধেকের বেশি পদ সংরক্ষিত ছিল কয়েকটি বিশেষ শ্রেণির জন্য, সেটি ফিরে আসায় তার প্রতিবাদ করার মধ্য দিয়ে এবারের আন্দোলন দানা বাঁধে। বলে রাখা দরকার, কোটায় সংরক্ষিত পদে নিয়োগ পেতে হলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ধাপে উত্তীর্ণ হতে হয়। প্রিলিমিনারী পরীক্ষা, লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভাতে যারা উর্ত্তীর্ণ হন, শুধু তাদের মধ্য থেকেই কোটায় সংরক্ষিত পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। তবু কোটাধারী আর কোটাবিহীন প্রার্থীর মধ্যে ফারাক তো আছেই; হোক-না তা একেবারে চূড়ান্ত ধাপে। আন্দোলন শুরু হয়েছিল একে ঘিরে।

আন্দোলন শুরুর পর বেশ কিছু দিন সরকার বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। আলাপ‑আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বিষয়টা কোর্টের কাছে থাকলেও সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলে সেটাই বোঝাতে পারত। ২০১৮ সালে সরকার যে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিল, সরকার যদি আন্দোলনকারীদের শুধু বলত যে, তারা ওই প্রজ্ঞাপনকে কোর্টে ডিফেন্ড করবেন; অর্থাৎ, ২০১৮-র আগের সেই ৫৬ শতাংশ কোটায় ফিরে যাবে না, তাহলে আন্দোলন হয়তো এত দূর গড়াত না।

তারপর আন্দোলন যখন এগোলো, তখন আরও অনেকেই যোগ দিতে শুরু করল। সরকারবিরোধীরা এর সাথে জড়িয়ে পড়বে বা এই আন্দোলনের সুযোগে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করবে–এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সরকারের দিক থেকে দরকার ছিল তাদেরকে সেই সুযোগটা না দেওয়া। আন্দোলন ছড়িয়ে যাওয়ার আগেই যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে আন্দোলনকারীদের শান্ত করা। বোঝা শক্ত, আন্দোলনের মুখে দাবি মেনে নেওয়াকে কি সরকার দুর্বলতা হিসেবে দেখেছিল কিনা। সে রকম ভাবনা থেকে থাকলে তা ভুল ছিল। একটি গণপ্রজাতন্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ সরকারের কাছে দাবি তুলবে, সরকার যৌক্তিক দাবি মেনে নেবে, আন্দোলনকারীরাও সরকারের সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝবে–এটাই কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু সরকার এ ক্ষেত্রে কতকটা হার্ডলাইনে গেল। ‘যা পার কর’–ধরনের আচরণ দেখলাম। এর সাথে যোগ হলো মাঝরাতে আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষমতসীন দলের ছাত্র সংগঠনের হামলা।

তারপর মোটামুটিভাবে একটা অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়েই ছিল। রংপুরে একজন ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনা তাতে ঘৃতাগুতি দিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে সদস্যের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটিকে গুলি করার অভিযোগ, তিনি প্রোপরশোনেট বলপ্রয়োগ করেননি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি ছেলেটিকে নিবৃত করার জন্য দরকারের চেয়ে বেশি বলপ্রয়োগ করেছেন। তিনি আরও নানা উপায়ে নিবৃত করার চেষ্টা করতে পারতেন। এর জবাব কে দেবে?

আবার মেট্রোরেলের স্থাপনায় আগুন দেওয়াটাকে শুধু স্থাপনার ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ছয় থেকে আট মিনিট পরপর ট্রেন আসে। ট্রেনভর্তি মানুষ থাকে। মেট্রো স্টেশনে আগুন থেকে ট্রেনে আগুন লাগলে কী অবস্থা হতো ভাবা যায়? এসব ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ ছাড়া উপায়ই‑বা কী! তাই ঢালাওভাবে বলপ্রয়োগকে নিন্দা বা স্বাগত জানানোর সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার আলাদা আলাদা অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দরকার। ওই পরিস্থিতিতে ওই সময়ে প্রাণঘাতি গুলি ব্যবহার অনিবার্য ছিল, নাকি রাবার বুলেট বা অন্য কিছু দিয়ে ঠেকানো যেত–সেই বিষয়টা দেখা দরকার।

অনেক মৃত্যুর খবর, ঘটনার সাবজেক্টিভ বিবরণ ঘুরে বেড়াচ্ছে পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় আর সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেগুলোর বর্ণনা এই লেখায় আরেকবার না দিয়েও বলা যায়, এর অনেকগুলো কোনোভাবেই “জাস্টিফাই” করা সম্ভব নয়। এরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই-বোন। এই দেশের সন্তান এরা। এদেরকে “ডিজওউন” করতে পারেন না। এমনকি কারও কোনো রাজনৈতিক পরিচয় তার মৃত্যু বা হত্যাকে জাস্টিফাই করে না। যদি না ওই ঘটনায় তিনি রাষ্ট্র ও জনগণের জানমালের জন্য ক্ষতিকর কোনো ভূমিকা নিয়ে থাকেন, যেটা থেকে সর্বোচ্চ লেভেলের বলপ্রয়োগ (গুলি করা) ছাড়া তাকে নিবৃত করার আর কোনো উপায় না থাকে।

সুতরাং “পেছনে এ ছিলো, ও ছিলো”–এসব কোন সান্ত্বনা না। পেছনে যে বা যারা ছিল, তাকে বা তাদেরকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় বিচারের সম্মুখীন করা হোক। তাই বলে অতি-উৎসাহী হয়ে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।


এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কয়েকটি প্রস্তাব:


এক.
প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনাকে অন্তর্ভূক্ত করে নিহতদের একটি তালিকা করতে হবে। প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতের নিরপেক্ষ ভাষ্য সেখানে থাকতে হবে। দায়ীদের সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও একই সাথে নিতে হবে।

দুই. আহতদের তালিকা করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও প্রতিটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতের নিরপেক্ষ ভাষ্য সেখানে থাকতে হবে। দায়ীদের সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে। 

তিন. অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও স্থাপনার ক্ষতিসাধনের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরুপণ করতে হবে। দায়ীদের সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে। মামলার অজ্ঞাতনামা আসামির নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না।

চার. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের ওপর ১৫ জুলাই রাতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের হামলার বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে এবং দায়ীদের চিহ্নিত করে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো গাফলতি ছিল কিনা, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। গাফলতি থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

পাঁচ. আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। নিহতদের পরিবারকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।

আন্দোলনকারী ও সরকার দুই পক্ষকেই বুঝতে হবে জানমালের এই ক্ষতি এই দেশের মানুষ দেখতে চায় না। গুলি করে মানুষ মারাও না; অবকাঠামোতে আগুন দিয়ে জনজীবন স্থবির করে দেওয়াও না। জীবনের ক্ষতি অপূরণীয়। সুতরাং এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, কেউ যাতে ঘটাতে না পারে সেই বিষয়টাতে দুই পক্ষকেই আন্তরিক হতে হবে।

কোটার দাবি তো পূরণ হয়েছে। এখন দাবি কী? এই আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনায় আহত, নিহত ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাগুলোর যথার্থ তদন্ত ও বিচার এবং দায়ীদের অ্যাকাউন্টেবল করা। তাহলে, ধৈর্য্য ধরতে হবে। এত বড় ঘটনার তদন্ত ও বিচার পর্যন্ত আন্দোলন চলমান রাখা কোনো বাস্তবসম্মত বিষয় না। এটা আন্দোলনের নেতাদেরও বুঝতে হবে।

তাপস বড়ুয়া: বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]