দম্ভের পতন, এবার স্বস্তি ও একটু শান্তি দরকার

দেশ। একটি শব্দ। এর অর্থ খুঁজতে গেলে যেমন ভূখণ্ড, পতাকা, রাষ্ট্রীয় প্রতীক আসে, তেমনি এর সাথে আরও বহু কিছু জড়িয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি জড়িয়ে থাকে, তা হলো–মানুষ। অথচ গেল কয়েকটা দিন এই মানুষ শব্দটিকেই যেন ভুলে গেছি। একদিকে জনস্রোত, আরেকদিকে ক্ষমতার দম্ভ। একদিকে বুলেট, আরেকদিকে পেতে রাখা বুক। সংবাদমাধ্যম খুললেই একগাদা নাম, যারা সংখ্যা হয়ে গেছে। অথচ, যাদের নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

শিক্ষার্থীরা ক্ষমতা চায়নি। শিক্ষার্থীরা কিছু সুনির্দিষ্ট বদল চেয়েছিল। কিন্তু সেই শিক্ষার্থীদের সেই চাওয়াকে, অর্থনৈতিক সংকটে দাঁড়িয়ে কর্মসংস্থানের দিকে চেয়ে থাকা বেকার ও ভবিষ্য বেকার জনগোষ্ঠীর উৎকণ্ঠা এবং তা থেকে উদ্ভুত ক্ষোভ ও চাওয়ার তীব্রতাকে বুঝতে পারেনি ক্ষমতাসীনরা। তারা ভেবেছিল বিগত দিনগুলোতে যেভাবে বলপ্রয়োগ করে নানা দাবির আন্দোলনের টুঁটি চেপে ধরা গেছে, তেমনটা এবারও যাবে।

কেন এমন মনে হলো? কারণ, দম্ভ। কীসের? ক্ষমতার। এই দম্ভে কোনো মৃত্যুকেই আর মৃত্যু বলে মনে হয় না। মৃতকেও পক্ষে‑বিপক্ষে ভাগ করে ফেলা যায়। যেকোনো একচেটিয়া শাসনের স্বরূপই এমন। প্রতি মুহূর্তেই মনে হয়, এটা আমার নয়, ওর। এক ধরনের বাইনারির জন্ম হয় একেবারে ওপর থেকে নিচুতলা পর্যন্ত। এই একচেটিয়া শাসনের পতন যখন হয়, তখন এই বাইনারিই আবার ফিরে আসে। তবে অন্য চেহারায়। আগের সাদা রাতারাতি বনে যায় কালো। আর আগের কালো বনে যায় সাদা।

বাংলাদেশে এখন তেমনটাই প্রত্যক্ষ করছে। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে শেখ হাসিনার পলায়নের পর বাংলাদেশে সোমবার রাজধানী ঢাকা এবং দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, স্থাপনায় আক্রমণ, পিটুনি কিংবা হামলায় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১৩৭ জন মারা যাওয়ার তথ্য দিয়েছে বিবিসি বাংলা। তারা বলছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতন পর্যন্ত এবং এই আন্দোলনে বিজয়ের উন্মাদনায় দেশে সাড়ে তিন শয়ের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। এদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউ মুটে, কেউ সাংবাদিক, কেউ পুলিশ, কেউ রাজনৈতিক দলের নেতা বা কর্মী। পরিচয় যা‑ই হোক, এদের আসল পরিচয় হলো–উলুখাগড়া, রাজায় রাজায় যুদ্ধে যাদের প্রাণ যাওয়াই দস্তুর।

ফলে প্রাণ যাচ্ছে। এ যেন থামার নয়। স্বৈরাচার বা একচেটিয়া শাসন কাঠামোয় দাঁড়িয়ে আগের শাসকেরা যেভাবে মানুষের প্রাণের দামকে তলানিতে নিয়ে গিয়েছিল, তার পতনের পর সেই দাম বাড়তে আমরা দেখিনি। 

হ্যাঁ, যেকোনো স্বৈরশাসকের মতোই আগের শাসকগোষ্ঠী জনগণের করের টাকায় পোষা রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমিয়েছে, হামলা করেছে, যেকোনো অধিকারের আন্দোলনকে প্রতিহতের নামে হত্যা‑গুম করেছে। এরই প্রতিবাদে কিন্তু সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের অধিকারের আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়ে ফুঁসে উঠেছিল। সেই গণবিস্ফোরণের বিজয় হয়েছে। কিন্তু সেই বিজয় উদযাপনের নামে আরও আরও মানুষ হত্যার শিকার হলো। নানা স্থানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর বাদ যায়নি।

বিক্ষুব্ধ মানুষ পুলিশকেই খল হিসেবে ভেবে নিয়ে তাকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। অথচ একবারও ভেবে দেখেনি এই প্রতিটি পুলিশ সদস্য তার করের পয়সাতেই প্রশিক্ষিত। একদিন সব ঝড় থামে। সেই থেমে যাওয়া ঝড়ে এই পুলিশই কিন্তু তাদের নিরাপত্তা দেবে। এই পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, আছে হত্যা গুমের মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ, যার অনেক কিছু সত্য। কিন্তু এই অভিযোগগুলোর কোনো তদন্ত ছাড়া, কোনো বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া যেভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তা আদতে আত্মঘাতি। কারণ, পাহারাদার মেরে ফেললে ঘর পাহারার কেউ আর থাকে না।

আরেকটি পেশাগোষ্ঠী ভীষণভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। তা হলো–সাংবাদিক। অথচ এই আক্রমণের আগে আক্রমণকারীরা একবারও ভেবে দেখছে না যে, তাদের ফুঁসে ওঠার সময়ই কিন্তু সাংবাদিকেরা সংবাদ প্রকাশ করে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁরা ভুলে গিয়েছেন যে, জনতা ফুঁসে ওঠার কারণে বহু সাংবাদিক সাহস করে নিজের কথাটা বলতে পেরেছেন। একটা সংবাদমাধ্যমের সাথে বহু লোক জড়িয়ে থাকে। সাংবাদিকেরা সংবাদ খান না। তাঁদেরও অন্য সবার মতো ভাত খেয়েই বাঁচতে হয়। লাঠির বাড়ি বা বুলেটে তাঁরাও আঘাত পান। ফলে বহু বহু ঝঞ্ঝা পেরিয়েই তাঁকে নিজের কাজটি করতে হয়।

সোমবার শেখ হাসিনার দেশ ত্যাগের খবর শোনার পর অভূতপূর্ব এক মানবস্রোত পথে নেমে এসেছিল। কেন? কারণ, ভয়টি পালিয়ে গেছে। একজন ব্যক্তির পলায়নের পরই কেবল শত‑সহস্র মানুষ পথে নেমে কথা বলতে, হুঙ্কার দিতে শুরু করেছে। এতদিন সে বলতে পারেনি। তাই এখন সে বলছে। এই একই দশা তো সংবাদমাধ্যমেরও। বরং আরও বেশি। তাহলে সে সহানুভূতির বদলে, গুটিকয় দলদাস সাংবাদিককে বাদ দিয়ে সব সাংবাদিককে কেন লক্ষ্যবস্তু করল। এর মধ্য দিয়ে নতুন কোনো শক্তি ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ঘোষণাটি দেওয়ার আগেই কি সংবাদমাধ্যমের ওপর ফের সেন্সরের কাঁচি চালানোর হুঙ্কারটি দিয়ে রাখল না।

বিক্ষোভ, বিদ্রোহ বা গণঅভ্যুত্থান তো হয়েছিল একচেটিয়া শাসন, তাদের বজ্রআটুনি ও একতরফা বয়ানের বিরুদ্ধে। তাহলে আরেকটি একতরফা বয়ান অহেতুক হাজির হয়ে কি এরই মধ্যে চোখ রাঙাতে শুরু করছে না? আন্দোলনের মূল শক্তি শিক্ষার্থীদের এড়িয়ে গুটিকয় রাজনৈতিক দল কি আবারও ক্ষমতার হালুয়া–রুটির ভাগ বসাতে তৎপর নয়? তেমনটি হলে কিন্তু শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এই আত্মত্যাগ বৃথা হয়ে যাবে। আবারও এক কঠোর শাসনের পাল্লায় পড়তে হতে পারে। আশার কথা যে শিক্ষার্থীরা সে কথা শুরুতেই বুঝেছেন। তাঁরা সরাসরি মানুষকে এসব সহিংসতা, কথা বলার অধিকার হরণের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। একইভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা সেই গুটিকয় শিক্ষকের জোট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কও জানিয়ে রেখেছে যে, এসব সহিংসতাকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

বিস্ময়ের বিষয় এই যে, রাষ্ট্রের মাথা থেকে স্বৈরাচারের পলায়নের পর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাবাহিনীকে কিছু করতে দেখা যায়নি। তারা যেন চুপ থেকে দেড় শতাধিক মানুষকে মরতে দিয়েছে। তারা কঠোর কোনো ভাষ্য হাজির করেনি। একের পর এক থানায় হামলা হয়েছে, জনগণের করের পয়সায় নির্মিত রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা হয়েছে, অমুসলিমদের বাড়ি ঘর, উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে, জবাই, গুলি, অগ্নিসংযোগ–সবই হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে গণভবন, সংসদ ভবন, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি, ব্যাংক, এনজিও, হাসপাতাল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন–কী নেই তালিকায়! কিন্তু তারা অচল পাথরের মতো সব দেখেছে। আর পুলিশ, সোমবার সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের তালিকায় সম্ভবত পুলিশই ছিল। তার নিরাপত্তাও তো দেওয়ার কথা নিরাপত্তাবাহিনীরই। কারণ, তারা এই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিল।

সারা রাত ফোনের পর ফোন এসেছে–কী হবে? মুসলমান-হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ নির্বিশেষে প্রায় সব মত ও পথের মানুষ ফোন করে জানতে চেয়েছে, কী হচ্ছে দেশে? কে জিতল? বিজয়ীরা কী চায়? কীভাবে শৃঙ্খলা ফিরবে? হাজারটা প্রশ্ন। কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাব তো নেই। একই প্রশ্ন তো এই এখানেও ঘুরে ফিরে আসছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাকে কব্জায় নিতে চায় অন্য কেউ। শিক্ষার্থীরা সজাগ। কিন্তু যারা তৎপর, তারা কিন্তু বহু ঘাটের জল খাওয়া। আশা জাগে, আবার নৈরাশ্যও কি চেপে বসে না?

হ্যাঁ, একচেটিয়া শাসনের পতন এমনভাবেই হয়। সাথে অর্থনৈতিক সংকট থাকলে এর প্রভাব হয় ভয়াবহ। শ্রীলঙ্কায় হয়েছে, তিউনেশিয়ায় হয়েছে, লিবিয়ায় হয়েছে। অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। কিন্তু মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় সংকটটি অর্থনৈতিক। ফলে বিজয় উদযাপন বা যে কারণকে সামনে রেখেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা হোক না কেন, তা আদতে নিজেদের সম্পদ। এর মূল্য করের পয়সায় নিজেকেই চোকাতে হবে। ভিন্নমতের বলে কোনো মানুষের ঘরে বা কার্যালয়ে হামলা চালানোর সময় মনে রাখা জরুরি যে, এভাবে ভিন্নমতের ওপর হামলার কারণেই কিন্তু আজ আপনি ফুঁসে উঠেছেন, আপনার হাতে লাঠি-রড ইত্যাদি উঠেছে। আপনি আক্রমণকারীর ভূমিকায় নেমেছেন। আপনার মতকে দমন করা না হলে আপনি হয়তো ঘরের শিশুটিকে নিয়ে আজও খেলতেন। আপনার চোখ লাল হতো না। তাই কারও উপাসনালয়, কারও ভাস্কর্য, শিল্প, সংস্কৃতি, কারও লেবাস, কারও পেশা বা কার্যালয়ে হামলার আগে ভাবুন, মনে করার চেষ্টা করুন নিজের বিগত দশাকে। আপনি নিজে আগ্রাসী হয়ে অজ্ঞাতে ভবিষ্যতের ফ্রাঙ্কানস্টাইনের  জন্ম দিচ্ছেন না তো?

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]