‘গুরু-শিষ্যের’ সরকারের কাছে প্রত্যাশা

রক্তস্নাত জুলাই-আগস্ট ২০২৪। কয়েক সপ্তাহের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। লক্ষ্য ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার। সরকারের ভুল ব্যবস্থাপনা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন ক্রমেই বেগবান হয়ে ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘাতে কয়েক শ মানুষ নিহত হয়। ইউনিসেফের হিসেবে, নিহতদের মধ্যে ৩২ জনই শিশু। কেউ কেউ আবার নিজ বাড়িতেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া এত হতাহতের ঘটনা আর কোনো আন্দোলনে ঘটেনি বলে মনে করেন অনেকেই। মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে আন্দোলন জন বিস্ফোরণে রূপ নেয়। অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, অভিভাবক, শিল্পী, আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও সরকারি কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ ও পেশাজীবী এমনকি শ্রমজীবী মানুষ। শিক্ষার্থীদের আবেগ পাশ কাটানো, বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর ‘রাজাকার’ শব্দের প্রয়োগজনিত সৃষ্ট ক্ষোভ, মধ্য জুলাইয়ে শহীদ সাঈদের আত্মত্যাগ, পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের ছাত্র-যুব সংগঠনের বেপরোয়া হামলা ও অবশেষে ডিবি অফিসে আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে আটকে একের পর এক সাজানো নাটক মঞ্চস্থ করার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ গণরোষের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

কোটা সংস্কারে নামা শিক্ষার্থীদের এক পর্যায়ের নয় দফা দাবি সরকার পতনের এক দফায় পরিণত হয়। ঘোষণা দেওয়া হয়, ৫ আগস্ট  ঢাকায় লংমার্চ করার। শিক্ষার্থীদের ডাকে লাখো মানুষ কারফিউ ভঙ্গ করে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ ঘেরাও করে। গণভবনে জনস্রোত পৌঁছার আগেই শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন ও দেশত্যাগ করেন। স্মরণকালের ভয়াবহ এক নিরাপত্তা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে তাঁর নেতা-কর্মী, অনুগত বাহিনী ও আত্মীয় -স্বজনসহ দেশের মানুষ । জনরোষে সৃষ্টি হয় দাঙ্গা। চলে ভাঙচুর ও জ্বালাও-পোড়াও। হত্যার শিকার হতে হয় অনেককেই। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং পুলিশ বাহিনী নানা স্থানে ব্যাপক হামলার শিকার হয়। ভস্মীভূত করে দেওয়া হয় একাধিক থানা, সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা। ধারণা করা হয়, সেনাপ্রধান আন্তরিকতার সাথে বিষয়টিকে না দেখলে, হত্যা ও ধ্বংসের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হত। দমবন্ধ হওয়া এ নারকীয় পরিস্থিতির মধ্যে একটি খুশির খবর হলো, ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এ সরকার দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত থাকবেন। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ও আন্দোলনকারীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে গঠিত ও পরিচালিত এ সরকারের কাছে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রত্যাশা অনেক।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবিপরিমিত সংখ্যক উপদেষ্টা দিয়ে, সরকারহীন কালের নৈরাজ্য দমন করে অতিদ্রুত সকল সমস্যার সমাধান করা যে সম্ভব নয় তা কিন্তু স্পষ্ট। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে, সরকারের আশু কাজ কী কী হওয়া উচিত। উপদেষ্টা পরিষদে নবীন তথা ‘শিষ্য-তুল্য’ সদস্যের পাশাপাশি রয়েছেন ‘গুরু (শিক্ষক) ও গুরু তুল্য’ অনেকেই। আশা করি, আন্দোলনের বাঁকসমূহ লক্ষ্য করে তারা বুঝতে সক্ষম হবেন কোন প্রেক্ষাপটে আন্দোলনটি বিনির্মিত হয়েছে, কী কী অনুষঙ্গ মানুষকে আন্দোলনের দিকে ধাবিত করেছে, বর্তমানে জরুরি ভিত্তিতে কী কী কাজ করতে হবে ইত্যাদি। কোটা সংস্কার থেকে এখন যেহেতু রাষ্ট্র সংস্কারের দিকে অনেকের মনোযোগ, কাজেই এ বিষয়ে একটি কর্ম পরিকল্পনা থাকলে ভাল হবে। সবিস্তার একটি কর্ম পরিকল্পনায় মেয়াদ ও প্রয়োজনভিত্তিক কাজের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, মানুষের এখন সবার আগে প্রয়োজন স্থিতিশীল একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। হঠাৎ থেমে যাওয়া জীবন-জীবিকাকে নিরাপদ ও সচল রাখা। যেকোনো সংঘাতময় পরিস্থিতিতে  ‘ডু নো হার্ম (কোন ক্ষতি নয়)’ ও ‘ ডু মোর গুড’ (একটু বেশি ভাল করা)—এ নীতিতে বিশ্বব্যাপী কাজ করা হয়। জাতিসংঘ নিজেও বিভিন্ন স্থানে ‘শান্তি ও উন্নয়ন’ নীতিতে কাজ করে সুফল পেয়েছে। অর্থাৎ, আগে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় সীমার মধ্যে রাখা। এ প্রধান দুটি কাজ করা গেলে আপাতত পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।  শান্তি প্রতিষ্ঠায় বেশ কিছু নিয়ামক রয়েছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী, সংবাদ মাধ্যম, সুশীল সমাজ, শিক্ষার্থীসহ অনেকে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ও জনগণের মাঝে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টির মাধ্যমে ধীরে ধীরে দূর করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে বুঝতে হবে যে তাদের বেতনাদি ও সুযোগ-সুবিধা জনগণের করের টাকায় পরিশোধ করা হয়। কাজেই তারা যেন সন্তুষ্ট থাকেন এমনভাবে সেবা দিতে হবে। জনগণকেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। এক কথায়, জনগণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী একে অপরের পরিপূরক। 

শান্তি প্রতিষ্ঠায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা ব্যাপক। পেশাদারিত্বের সাথে সঠিক তথ্য ও ইস্যুভিত্তিক নির্মোহ বিশ্লেষণ মানুষের মাঝে তুলে ধরতে হবে। পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশনের সংস্কৃতি বদলাতে হবে। বেশি বেশি অনুসন্ধানী সংবাদ পরিবেশন করে অপরাধ, দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারি বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে  মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সংবাদ মাধ্যমকে পেশাদারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ জরুরি। হাত দিতে হবে দক্ষ, সুষ্ঠু ও স্বজনপ্রীতিহীন মালিকানায়। সংবাদ পরিবেশনে থাকা যাবে না রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংযুক্তি। সংবাদ মাধ্যমে নিয়োগ, পদোন্নতি হতে হবে যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে, সখ্যতায় নয়।

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন। ফাইল ছবিআমরা দেখেছি, আগের সরকারগুলোর সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের প্রতি কদর্যপূর্ণ আচরণ। আনন্দের কথা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে সুশীল সমাজ গুরুত্ব পেয়েছে। এ সম্মান একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও দিতে হবে। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। সংবাদ মাধ্যম ও সুশীল সমাজকে ভয়ের আবর্ত থেকে বের করে আনতে হবে  তারা যেন সরকারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়ে জনগণ ও সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারে। বর্তমান নৈরাজ্য মোকাবেলাতে তাদেরকে সাথে রাখা উচিত।

বৃহত্তর পরিসরে সংস্কার চিন্তায় আবারও ফিরে যাই আন্দোলনের সময়ে। কেন মানুষ তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছেন? তারা চান সুশাসন। সরকারের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, জনগণের প্রয়োজনে/ডাকে তাৎক্ষণিক সাড়া ও প্রশাসনের সকল স্তরে সুষম ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। তারা চান একটি ন্যায্য সমাজ যেখানে থাকবে দল, মত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান সুযোগ। আন্দোলনটির পটভূমি এমন সময়ে রচিত হয়েছে যখন একশ্রেণীর সরকারী কর্মকর্তাদের হাজার কোটি, এমনকি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদেরও, শত কোটি টাকার দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী নিজের মুখে বলেছেন যে, তাঁর অফিসের কর্মী ৪০০ কোটি টাকার মালিক বনে গিয়েছেন এবং হেলিকপ্টারে যাতায়াত করেন। প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের গাড়ি চালকের বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে টাকা বানানোর খবরটিও ভাইরাল হতে থাকে। দ্রব্যমূল্যের লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষ আগে থেকেই ক্ষিপ্ত। আন্দোলনকারী এক ছাত্রী সংবাদমাধ্যমে ক্ষোভের সাথে বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী দিনে যেখানে একবারও ভালো খাবার পায় না, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক’।

আন্দোলনকারীদের আরও কিছু ইস্যুর মধ্যে ছিল, দেশি টাকা ও সম্পদ দুর্নীতি করে দুবাই ও বেগম পাড়ার মতো স্থানে পাচার করে দেশকে নিঃস্ব বানানো হচ্ছে। পুলিশের গুলির পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে অনেকেই বলেছেন, ‘আমাদের করের টাকায় গুলি কেনে, পুলিশ পোষে, আমাদের বুকেই গুলি করাচ্ছে’। একটি বড় অংশের অভিযোগ ছিল যে তারা জন্মের পর কোনদিন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। সরকারি অফিসে তাদের সেবার পরিবর্তে দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয়। এমন অন্তহীন সমস্যায় মনে হতেই পারে, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’। হতাশ হলে চলবে না। তারুণ্য শক্তি আজ জেগে উঠেছে। এ শক্তির আবেগ অতি প্রবল। সরকারহীনতার ভঙ্গুর সময়ে তারা অনেক ক্ষেত্রেই হাল ধরেছে। যান চলাচলে শৃঙ্খলা স্থাপন করেছে, বাজার মনিটরিং করে জিনিস-পত্রের দাম যৌক্তিক করার চেষ্টা করছে। তাদের এ আবেগকে যত্নের সাথে লালন করতে পারলে ও সঠিক পথে পরিচালন করতে পারলে, তারা রাষ্ট্রের নানা বিষয়ে সংস্কারে  অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। গুরুত্বের ক্রমানুসারে একেকটি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে সাজাতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের আস্থাভাজন হিসেবে তৈরি হতে সহায়তা করতে হবে।  সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিতায় আনতে হবে। সেজন্য, আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন জরুরি।

সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির মধ্যে আনার জন্য কার্যকর সংবাদমাধ্যম ও শক্তিশালী সুশীল সমাজের বিকল্প নেই। দু’টি প্রতিষ্ঠানেরই সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও গণমাধ্যম মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারছে কিনা তা কিন্তু দেখার দায়িত্ব গণমাধ্যম ভোক্তাদের। এভাবে একটি সত্যিকারের কল্যাণকামী, জনমুখী ও জবাবদিহিতামূলক শাসন ব্যবস্থার ভিত রচনা করতে হবে যেখানে পুরো পদ্ধতিটিই হবে জনগণের অধিকতর ভালোর জন্য। একটি বহুত্ববাদী মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে তাই ‘গুরু-শিষ্যের’ সরকারের নির্মোহ অভিযাত্রার দিকে আমরা তাকিয়ে রইলাম।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]