আয়নাঘরের বন্দীরা সবেমাত্র তাদের ভয়াবহ অগ্নিপরীক্ষার বর্ণনা করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা দ্বারা পরিচালিত হতো এই গোপন বন্দিশালা, যেখানে বন্দীদের অমানবিক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। নানা বয়সের এবং নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের এই বন্দীদের মধ্যে কয়েকজনকে এক দশকেরও বেশি সময় আটক রাখা হয়েছে।
১৫ বছর কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের পর শেখ হাসিনা এখন ক্ষমতাচ্যুত। বাংলাদেশের বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য। এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁদের আত্মীয়-স্বজনদের মনের ও আত্মার শান্তির জন্য তাঁদের প্রিয়জনের অবস্থান জানার অধিকার আছে। কিন্তু শুধু গুমের শিকারদের জন্য নয়, গত দুই দশকে সরকারের দ্বারা যারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের জন্যও ন্যায়বিচার প্রয়োজন।
ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলনের বোধ তৈরি না হলে ট্রমার মধ্যে থাকা একটি দেশ খুব কমই এগিয়ে যেতে পারে। অন্য কথায়, বাংলাদেশের জনগণ এ থেকে উত্তরণের যোগ্য। আর উত্তরণের জন্য তাদের প্রয়োজন সত্য, ন্যায়বিচার ও সম্মিলন। এটি অর্জনের জন্য বাংলাদেশের একটি ট্রুথ কমিশন দরকার।
ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস রিসোর্স সেন্টারের মতে, ট্রুথ কমিশন একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘বলপূর্বক গুম, বিচারবহির্ভূত মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যান্য অপরাধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া বহু উত্তরহীন প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে।
ট্রুথ কমিশন বিশেষজ্ঞ প্রিসিলা বি হায়নারের মত–এতে সাধারণত চারটি উপাদান থাকে: ১) তারা বর্তমানের চেয়ে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে বেশি মনোনিবেশ করে; ২) কোনো বিশেষ ঘটনার বদলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ব্যাপক চিত্র উপস্থাপন করতে চায়; ৩) অল্প সময়ের জন্য কাজ করলেও তারা তাদের অনুসন্ধানের সংক্ষিপ্তসার প্রতিবেদন আকারে পেশ করে; এবং পরিশেষে ৪) তাদের সর্বদা এক ধরনের কর্তৃত্ব থাকে, যা তাদের তথ্য প্রাপ্তি ও এর সুরক্ষার অনুমতি দেয়, বিশেষ করে যখন তারা গুমের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করে।
ট্রুথ কমিশন এশিয়ায় নতুন ধারণা নয়। ২০১০ সালে দুর্নীতি মোকাবিলার জন্য ফিলিপাইনে ট্রুথ কমিশন গঠন হয়েছিল। বাংলাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের অধীনে একটি ট্রুথ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যা বলপূর্বক গুমের সব ঘটনা প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। একটি আদর্শ কমিশন গঠনে বলপূর্বক গুমের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক আইনজীবীদের সাথে নেওয়া উচিত। অনেক আন্তর্জাতিক আইনজীবী এই গুরুত্বপূর্ণ সত্য-সন্ধানী প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
বাংলাদেশ অনেক উদাহরণ টানতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন (টিআরসি) প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বর্ণবাদী শাসনামলে জাতির জন্য নিপীড়নমূলক অভিজ্ঞতা মোকাবিলার জন্য। জাতীয় ঐক্যমতের সরকারই এটা করেছিল। টিআরসি প্রক্রিয়া থেকে বর্ণবাদ যুগে সংঘটিত অপরাধের জন্য হওয়া কমপক্ষে ১৩৭টি মামলা দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত ও বিচারের জন্য নথিভুক্ত করা হয়।
কলম্বিয়ার ট্রুথ কমিশন কলম্বিয়ার সরকার এবং সে দেশের বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর (ফার্ক‑ইপি) মধ্যে ২০১৬ সালের শান্তি চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৭০ ও ৮০-র দশকে ঘটে যাওয়া বলপূর্বক অন্তর্ধানের সব ঘটনা অনুসন্ধানের বিধান যুক্ত ছিল।
বাংলাদেশ ট্রুথ কমিশন বলপূর্বক গুমের অপরাধীদের বিচারের সুপারিশ করতে পারে। একই সঙ্গে এই বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, নাকি স্থানীয় আদালতে করা উচিত সে বিষয়েও তাদের পরামর্শ দিতে পারে। কমিশন এমনকি অপরাধীদের বিচারের জন্য কলম্বিয়ার মতো নিজস্ব আদালতও গঠন করতে পারে। কলম্বিয়ায় লাখো মানুষ হত্যার বিচারে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বিচার আদালত গঠন করা হয়েছিল। সেই বিচারে একজন জেনারেল এবং আরও দশজন মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা স্বীকার করেছিলেন।
আর্জেন্টিনার ট্রুথ কমিশন তথাকথিত ‘ডার্টি ওয়ার’‑এর সময় সংঘটিত ৩০ হাজারের বেশি জোরপূর্বক অন্তর্ধানের তদন্ত করেছে। আর্জেন্টিনার ট্রুথ কমিশনের প্রতিবেদন জান্তা শাসকদের বিচারের দ্বার উন্মুক্ত করেছে, যা সফলভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার করেছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ। হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অভিজ্ঞ বিভিন্ন দেশের কাছে ট্রুথ কমিশনের অভিজ্ঞতা জানানোর জন্য অনুরোধ করতে পারে। গুমকাণ্ডের ভুক্তভোগী, পরিবার, এমনকি সমগ্র গোষ্ঠী প্রায়শই ক্ষতিপূরণের দাবিদার, যা আন্তর্জাতিক আইনেও স্বীকৃত।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও এর কারণে হওয়া ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী এ সম্পর্কিত বিধি ও ব্যবস্থা যেন পর্যাপ্ত, কার্যকর, দ্রুত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেকোনো অর্থনৈতিক ক্ষতি, উপার্জনের ক্ষতি, অর্থনৈতিক সুযোগ হারানো এবং নৈতিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসনে চিকিৎসা ও মানসিক যত্নের পাশাপাশি সামাজিক সেবাও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
এমন কিছুর পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে সম্পর্কিত নীতিও এই ক্ষতিপূরণের অংশ হতে পারে এবং তা হওয়াই উচিত। কলম্বিয়াসহ লাতিন আমেরিকার যেসব দেশে গুমের মতো ঘটনা ঘটেছে, ট্রুথ কমিশন ও ইন্টার‑আমেরিকান হোর্ট অব হিউম্যান রাইটস সাধারণত ক্ষতিপূরণের অংশ হিসেবেই এমন নীতির সুপারিশ করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় আন্তর্জাতিক কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পার্সনস ফ্রম ফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সকে অনুমোদন দেওয়া, যাতে রাষ্ট্র কখনোই এই ধরনের জঘন্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি করতে না পারে এবং যা জোরপূর্বক গুমকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য দেশীয় আইন প্রণয়নের পথ প্রশস্ত করবে।
কেউ কেউ জাতিসংঘ-সমর্থিত অ্যাডহক আদালত স্থাপনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। এটি তাত্ত্বিকভাবে চমৎকার হলেও এই ধরনের বিষয় সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। এমন ট্রাইব্যুনালগুলো বেশ ব্যয়বহুল এবং এর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে জোরদার আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত এবং জাতিসংঘ এখন বাজেট সংকটে আছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ-সমর্থিত আরেকটি আদালত গঠনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিস্পৃহ হতে পারে।
কম্বোডিয়ার গণহত্যার বিচারে জাতিসংঘ-সমর্থিত খেমার রুজ ট্রাইব্যুনালের মোট ব্যয় ছিল ৩৩ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। সেখানে অনেক অপরাধী বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। অপরাধী তো বটেই অনেক ভুক্তভোগী এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্য ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই মারা গেছে।
বাংলাদেশে ভুক্তভোগীরা সেই সব অপরাধের জন্য ন্যায়বিচার পেতে এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে ইচ্ছুক কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, বিশেষত যে অপরাধগুলোর অধিকাংশই এখনো অপ্রকাশ্য।
ইফফাত রহমান: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষিত একজন কানাডিয়ান আইনজীবী। তিনি এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে কাজ করেন। তিনি সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, রুয়ান্ডার জন্য জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং কম্বোডিয়ার খেমার রুজ ট্রাইব্যুনালেও কাজ করেছেন। তিনি ইউএনএইচসিআর মালয়েশিয়াতেও অল্প সময়ের জন্য কাজ করেছেন।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]