যদি জিজ্ঞেস করা হয়, পৃথিবীর সব থেকে বড় সমস্যা কোনটা। তবে অনেকে অবশ্যই বলবেন দারিদ্র্য। কিন্তু কেন? কারণ পৃথিবীতে সম্পদের অভাব, অন্যদিকে মানুষের চাহিদা অসীম। সুতরাং সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণ করা কঠিন কাজ। সুতরাং কিছু মানুষকে দারিদ্র্য বরণ করে নিতে হয় নিয়তির পরিহাস মনে করে। আর কিছু বললে ভুল হবে পৃথিবীর বৃহত্তম জনগোষ্ঠী দারিদ্রতার করাল গ্রাসে নিষ্পেষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সত্যিই কি তাই? আমি যেহেতু অর্থনীতিবিদ না, তাই আমার পক্ষে সরাসরি কোন সদুত্তর দেওয়া উচিত বা সম্ভব না।
পুঁজিবাদী আর সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিকদের তো ঘুম নাই। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তত্ত্ব দিয়ে অর্থনীতির জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। আর পুঁজিবাদের জন্য সুবিধাজনক তত্ত্ব আবিষ্কার করতে পারলেও তো কথাই নাই। নোবেল পুরস্কারও জুটে যেতে পারে। কিন্তু দারিদ্র্য যেখানে ছিল সেখানেই আছে। উপরন্তু দেশে দেশে দারিদ্র্য আরও প্রসার লাভ করছে। আবার অন্যদিকে বিশাল বিত্তের পাহাড় গড়ে উঠছে একই দেশে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে।
ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সেই সাথে বেড়ে চলেছে সামাজিক অবক্ষয়। যুব সমাজে কীভাবে সহজে রাতারাতি ধনী হওয়া যায় তার প্রতিযোগিতা চলছে। এমন কি সহজে ধনী হওয়ার জন্য মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়তেও কুণ্ঠা বোধ করছে না কেউ কেউ। এর অনেকটাই যে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে উদ্ভূত সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। সুতরাং এই বৈষম্য দূর করার জন্য যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দরকার সে দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
একটা সময় পৃথিবী দুই বলয়ে বিভক্ত ছিল। এর এক পাশে ছিল ধনতন্ত্র, অন্য দিকে সমাজতন্ত্র। ধনতন্ত্র বা পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার দেশগুলোর পালের গোদা ছিল আমেরিকা।আর অর্থনৈতিক সাম্যবাদের ধারকবাহক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই দুই ছাতার নিচে আসা দেশগুলো তাদের নিজস্ব ধ্যানধারণা বাদ দিয়ে এই দুই দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অনুসরণ করতো। যেহেতু তাদের আশীর্বাদেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সরকার ক্ষমতায় থাকতো, তাই তাদের অন্ধ অনুকরণ ছাড়া গতি ছিল না। এই দেশগুলোকে নিজের কবজায় রাখার জন্য দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা যথাক্রমে সিআইএ এবং কেজিবি তাদের তাঁবেদের সরকার বসানোর তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল।
এই পরিক্রমায় ছোট দেশগুলোতে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের ঘটনা নিয়মিত ছিল। আর এই অবস্থা দেশগুলোর অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলে ছিল। যার সুযোগ নিত এই দুই পরাশক্তি এবং নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধার পুরোটা উসুল করে নিতে দ্বিধা করতো না। দুই পরাশক্তি নিজেদের তাঁবেদার সরকার ও সেই সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ক্রমান্বয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার সুযোগ দিত। পাশাপাশি ক্ষমতায় থাকার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে আনুগত্য ও তাঁবেদারির মুচলেকা নিয়ে নিত। বাংলাদেশও এর বাইরে ছিল না। এভাবে দেশের ভিতর ও বাইরে থেকে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে প্রচণ্ডভাবে বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে যুগযুগ ধরে।
দুটি বিষয়ের একটা হলো নীতি আর একটা হলো দুর্নীতি, যার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের অধিকার পদদলিত করা হয় বা যায় খুব সহজে। তাহলে দারিদ্র্য ও দুর্নীতির মোকাবেলায় অন্যান্য নীতিগুলির ওপর একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন। যদি নিরপেক্ষ বিচার বিশ্লেষণ করতে হয় তাহলে দুই মত ও পথের বিরোধী তাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণই বিশদভাবে বলে দেয় এদের দুর্বলতার জায়গাগুলো।
প্রথমত, পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় এক শ্রেণীর লোকদের সম্পদ অর্জনের ও পুঞ্জীভূত করার সুযোগ অবারিত করে দেওয়া হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি কোনো দায়িত্ব এখানে থাকে না।
পুঁজিপতিরা তাদের পুঞ্জীভূত সম্পদ অন্যভাবে ব্যয় করে। এই টাকা যদি বিনিয়োগ করা হয়, তবে সেখানে কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু তা না করে প্রথমে তারা ভোগ বিলাসে ও অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের সামর্থ্য দেখাতে ব্যয় করার চেষ্টা করে। ছোট খাট সামজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয়ের মহড়া দেয়। অন্যদিকে সম্পদ সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করে। বড় কোম্পানিগুলো তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড়াতে দেয় না। এমন কি ব্যবসার ঋণপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হাতে আর থাকে না। ফলে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান আর ব্যক্তি দেশের সম্পদের সিংহ ভাগ কুক্ষিগত করে রাখে। সম্পদ সৃষ্টির সুযোগও সীমিত হয়ে যায়। সেই জন্য পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় একদিকে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের সম্পদের মালিকানা হস্তগত হয়ে যায়। ব্রাজিল, কলম্বিয়া, মেক্সিকোর মতো দেশে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান যে কত বেশি তা বলার না। কারও কারও জেট বিমান আছে, আবার লাখ লাখ মানুষ আছে বস্তিতে অথবা খোলা আকাশের নিচে। এই দেশগুলোতে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কোনো কাজে আসে না। আবার আমেরিকা, ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশে সাধারণ মানুষের অবস্থা অতটা খারাপ না হলেও ধনী ও দরিদ্র বৈষম্য লক্ষণীয়। তাই আর যাই হক এই ব্যবস্থায় সামাজিক ন্যায়বিচার ও সবার জন্য অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অধিকারও খর্ব করা হয় এই ব্যবস্থায়। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকটা উপেক্ষিত হওয়ায় উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। কারণ মানুষ অন্যান্য প্রাণীর মত শুধু মাত্র জৈবিক চাহিদা পূরণের মধ্যেই জীবনকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে না। তার বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনের অধিকার ও অবকাশ। সবচাইতে দুর্বল দিক হলো ক্ষমতাসীন দলের স্বৈরাচারী দমন নীতি। যার নিষ্পেষণে দেশে দেশে প্রাণ দিতে হয়েছে ও হচ্ছে অগণিত মানুষকে। এই ধরনের ব্যবস্থা মানুষের সামান্য কিছু মৌলিক চাহিদার নিশ্চয়তা দেওয়া ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না। নব্বইয়ের দশক থেকে সমাজতন্ত্রের পতন শুরু হয়। সেই সাথে শেষ হয়েছে ঠাণ্ডা যুদ্ধ। এখন বেশির ভাগ সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশ মিশ্র অর্থনীতির অনুসারী। যাই হোক এটা মোটামুটি স্পষ্ট যে, এই দুই অর্থ ব্যবস্থাই দেশের আপামর জনগণের জন্য কোনো বাস্তবসম্মত স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না।
এবার আসা যাক ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায়। ইসলামি ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত না করে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও সাম্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য ও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। এটা করতে হলে অর্থ ব্যবস্থায় প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট রূপরেখা, যা কিনা সুস্পষ্টভাবে ইসলামি অর্থনীতিতে দেওয়া আছে। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যাকাত। দারিদ্র্য বিমোচনে এর কোনো বিকল্প নেই। ইসলামে বলা আছে, তোমাদের সম্পদে বঞ্চিতদের অধিকার আছে। সুতরাং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ মুসলিম সমাজ একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সহযোগিতা করবে। যাকাত ছাড়াও ইসলামে উশরের ব্যবস্থা আছে। অন্যদিকে বলপূর্বক ধনীদের থেকে কর আদায় করে তা দরিদ্রদের জন্য ব্যয় করলে উভয়ে উভয়ের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেটা শোষক আর শোষিত হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়। সনাতন সরকারি দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র আংশিকভাবে সফল হয়েছে। বেসরকারিভাবে সবচেয়ে মুখরোচক পদ্ধতি হলে ক্ষুদ্র ঋণ। দারিদ্র্য কি এতে দূর হয়? পরিসংখ্যান বলে কখনই না। উল্টো চড়া সুদের জন্য আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে বাংলাদেশে। তাত্ত্বিকেরা অকপটে স্বীকার করেছেন যে দারিদ্র্য সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল করা সম্ভব না।
সমাজের আর এক বিষফোঁড়া হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি আবার এই সব ভ্রান্ত অর্থ ব্যবস্থার ফল। ধনতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থায় যে যত বিত্তশালী সে সমাজে তত সম্মানিত ও ক্ষমতাশালী। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পদের জন্যও প্রয়োজন প্রচণ্ড অর্থের দাপট। যদি মানুষকে ধর্মীয় ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা না যায়, তবে সে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ধন সম্পদ অর্জন ও জমা করার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষ নীতি নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণভাবে অর্থ আর সম্পদের পূজারি হয়ে ওঠে। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো জীবনের জন্য অর্থ, অর্থের জন্য জীবন নয়। যেখানে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং এক আল্লাহ নির্দেশ পালনই মুখ্য উদ্দেশ্য।
খুব স্বল্প পরিসরে ইসলামি অর্থনীতির সব কিছু তুলে ধরা সম্ভব নয়। শুধু মাত্র অন্যান্য অর্থব্যবস্থার সাথে ইসলামি অর্থব্যবস্থার যে মৌলিক পার্থক্য তা তুলে ধরাই এখানে লক্ষ্য। যেহেতু বিষয়গুলো যেমন ব্যক্তিগত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পারস্পরিক সম্পর্কিত। বিষয়গুলোকে খণ্ডিতভাবে দেখে যেকোনো মতবাদ বা পদ্ধতি প্রণয়ন করলে তা সফল হওয়ার সম্ভবনা নেই। এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে পৃথিবীব্যাপী। তাই সমাধান চাইলে ইসলামি অর্থনীতিই প্রবর্তন করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।
ড. ইজাজ আহসান: লেখক ও গবেষক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]