বোতল ভূত বনাম বাংলাদেশের কৈশোর‑তারুণ্য...

বাজারে আলুর গুদামে আগুন লেগেছে। কেউ ছুটে ছুটে পানি আনছেন আগুন নেভাতে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন–কী ঘটছে। যাদের আলু ছিল, তারা মাথায় হাত রেখে সর্বস্বান্ত হয়ে বসে আছেন। আর কেউ কেউ এসে আলুপোড়া কুড়োচ্ছেন, ভর্তা খাবেন বলে।

আমাদের দেশের অবস্থাও আজ তেমনি। স্বাস্থ্যের চারটি ভাগ আছে। ১. শারীরিক স্বাস্থ্য ২. মানসিক স্বাস্থ্য ৩. সামাজিক স্বাস্থ্য ও ৪. আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য। এই প্রতিটি স্বাস্থ্য বিন্দুকে যোগ করলে তৈরি হয় সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য। 

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিন্যাস পিরামিড যদি দেখি, তাহলে দেখব ১৪ থেকে ২৫–এই বয়সের মানুষের সংখ্যা সর্বাধিক। বাংলাদেশের সব থেকে বড় সম্পদ এখন এই তারুণ্য। 

নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘আপনি আমাকে একটি ভালো মা দিলে আমি আপনাকে একটি ভালো জাতি উপহার দেব।’  আমাদের সন্তানদের মনস্তত্ত্ব বোঝাটা বর্তমানে খুবই জরুরি। কারণ, এরাই আগামীর দেশের কর্ণধার। আমাদের সন্তানদের সুরক্ষা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। 

কাহলিল জিবরান সন্তানদের নিয়ে তাঁর কবিতায় বলেছিলেন–

‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়।

জীবনের নিজের প্রতি নিজের যে তৃষ্ণা, তারা হলো তারই পুত্রকন্যা।

তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, তোমাদের থেকে নয়।

এবং যদিও তারা থাকে তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু তাদের মালিক তোমরা নও।

তুমি তাদের দিতে পারো তোমার ভালোবাসা,

কিন্তু দিতে পারো না তোমার চিন্তা, কারণ তাদের নিজেদের চিন্তা আছে।

তুমি তাদের শরীরকে বাসগৃহ জোগাতে পারো, কিন্তু তাদের আত্মাকে নয়।

কারণ তাদের আত্মা বাস করে ভবিষ্যতের ঘরে। যেখানে তুমি যেতে পারো না,

এমনকি তোমার স্বপ্নের মধ্যেও নয়।

তুমি তাদের মতো হওয়ার সাধনা করতে পারো, কিন্তু

তাদের তোমার মতো বানানোর চেষ্টা কোরো না।

কারণ জীবন পেছনের দিকে যায় না, গতকালের জন্যে বসেও থাকে না।

তোমরা হচ্ছ ধনুক, আর তোমাদের সন্তানেরা হচ্ছে ছুটে যাওয়া তির।

ধনুর্বিদ অনন্তের পথে চিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন তার তির ছোটে

দ্রুত আর দূরে।

তুমি ধনুক, তুমি বাঁকো, ধনুর্বিদের হাতে তোমার বেঁকে যাওয়া যেন আনন্দের জন্য হয়।

তিনি কেবল চলে যাওয়া তিরটিকে ভালোবাসেন তা-ই নয়,

তিনি তো দৃঢ় ধনুকটিকেও ভালোবাসেন।’

বাংলাদেশকে আমরা বলি দেশমাতৃকা। বাংলাদেশ বরাবর আমাদেরকে শক্তি যুগিয়েছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার। আমাদের বাংলাদেশের অখণ্ডতা আমাদের অস্তিত্ব।

আমাদের সন্তানদের নিয়ে আলু পোড়ার মনো‑রাজনৈতিক খেলার সমীক্ষণ এখন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণের আশু প্রয়োজন। আমাদের তারুণ্যকে নিরাপত্তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ, এই তরুণেরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। দেশের ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশ বাঁচলে সবাই বাঁচবে। অতীত ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে ন্যায়ের আন্দোলন চুরি হয়ে যায় রাজনীতি বিস্তারে, সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায়, পুঁজি রক্ষায় মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে নির্দিষ্ট স্বার্থ উদ্ধারে। 

সর্ষের মধ্যে নানান রঙের, নানান উদ্দেশ্যের ভূতগুলি খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত, সাদা বা কালো, স্বদেশ কিংবা বিদেশ ইত্যাদি দলদাস ভূতগুলি যেন খামচে না ধরে আমাদের সন্তানদের আত্মা। 

ভূরাজনৈতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এখন ভীষণ জরুরি খেলোয়াড়। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে বহির্বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশের রাজনৈতিক শক্তি নিজ স্বার্থেই আমাদের অতীতে, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে কাছে টেনে নেবে অথবা আছাড় দেবে। 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক খেলার অঙ্গনের কুশীলবরা এত বড় অরাজনৈতিক গণ‑আন্দোলনের ফায়দা পেতে চেষ্টা করবে না, এই ভাবনাটা বোকার স্বর্গে বসবাস। খেলাটা এখন শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আর নেই। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে পক্ষের জয় হয়েছে, তার বিরোধী পক্ষ কি চুপ করে বসে থাকবে?

একটি যুক্তিসংগত ন্যায্য দাবি থেকে বাংলাদেশের আপামর শিক্ষার্থীদের যে অরাজনৈতিক গণ‑আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেখানে প্রতিটি মানুষের যে সহমর্মিতা, তা তুলনাহীন। কিন্তু আমরা দেখেছি, একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক আন্দোলনকে রাজনীতিবিদরা অতীতেও বারবার চুরি করেছেন। খেয়াল করুন কীভাবে একটি ন্যায্য দাবির আন্দোলনে ছাত্রদের সংগঠিত হওয়া, সেই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণের সম্পৃক্ততা, সরকারি বাহিনীর আক্রমণ, মূল দাবি থেকে সরকার পতনের দাবি–এসব ফরমুলা তো আমরা বৈশ্বিক মানচিত্রে আগেও দেখেছি। কখনো সফল হয়েছে, কোথাও কোথাও বিফল হয়েছে।

শুধু মনে রাখা প্রয়োজন–আমরা ভারতের ২৯তম বা আমেরিকার ৫১তম রাজ্য হব না, অথবা আমেরিকার ৮১তম মিলিটারি ঘাঁটি হব না। নব্য উপনিবেশীকরণের এই পৃথিবীতে বিশ্বব্যাংক আর আইএমএফের নানা ঋণ আর সেই দাবিদাওয়ার ফাঁকফোকর সম্পর্কে জেন-জি ও জনমানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। 

বাংলাদেশের সব থেকে বড় শক্তি তার তারুণ্য। গোটা বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে বাংলাদেশের তারুণ্য কোন দিকে যাবে?

কারণ, একদিকে ছিল সাধারণ মানুষের প্রচণ্ড ভালোবাসা, আর আবেগ, যা রক্ত‑অশ্রুতে মাখা। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের রাজনৈতিক অপপ্রচার, যা বিশ্বের অঙ্গনে আন্দোলনের মূল সুরকে ভিন্নভাবে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা বলে একটি নিখুঁত কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। 

এই কেস স্টাডি যে শুধু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে, তা নয়; বরং, সামাজিক স্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপটেও হতে পারে।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বাংলাদেশ

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]