বন্যেরা বনে সুন্দর

ছোটবেলায় স্কুলে বাংলা পরীক্ষায় একটা ভাবসম্প্রসারণ করতে হতো ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। প্রশ্নটা প্রায়ই আসত, তাই মনে আছে। আমরা কিছুতেই এর মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারতাম না। আর ক্লাসের যে ছেলেটা একদম পিছনের বেঞ্চে বসত তার অবস্থাতো সহজেই বোঝা যেত। সে বেচারা কিছুক্ষণ এদিক সেদিক তাকিয়ে তারপর লেখা শুরু করত। কিছু একটাতো লিখতে হবে। তাই লেখা শুরু করত বনের পশুদের সৌন্দর্য বর্ণনা করে। বনের পশুরা খুবই সুন্দর, বিশেষ করে বাঘ ও হরিণ। বানরের সৌন্দর্যও কম কিসে। এবং কিছুক্ষণ পর পর এই সৌন্দর্য যে খুবই উল্লেখযোগ্য, তাই এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ–এসব লিখে খাতা ভরতো। 

খাতা দেখে  বাংলার শিক্ষক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, তোদের আর মানুষ করতে পারলাম না, তোরা বনের জীবজন্তুই রয়ে গেলি। সেই সূত্র ধরে আমরা একে অপরের নামকরণ করতাম। যেমন লজ্জাবতী বানর, খ্যাঁকশিয়াল, হনুমান, শিম্পাঞ্জী–আরও কত কি। আর যেহেতু স্যার ক্লাসেও প্রায়ই এটা লিখতে দিতেন তাই স্যারের নামও একপর্যায়ে বন সুন্দর স্যার হয়ে গেল। 

হঠাৎ এই কথাটা মনে আসলো বর্তমান সময়ের কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। বর্তমান বলাটা ঠিক হবে কি-না কেননা প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপারটার বহুল প্রচলন হয়েছে। বর্তমানের একটা ঘটনা নতুন করে ব্যাপারটা সামনে নিয়ে এসেছে। সেটা হল দেশের কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক থেকে বিচারক-পুলিশ-সরকারি চাকরিজীবী সবাই রাজনীতিবিদ বনে গিয়েছেন। যখন খুশি, যেভাবে খুশি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বসছেন। এই কিছুদিন আগে জনৈক নারী কর্মকর্তা কথা নেই বার্তা নেই এক জ্বালাময়ী রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে বসলেন। আর যা হয় তাই হলো, স্যোশাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে গেল। অথবা কথাটা যদি ঘুরিয়ে বলি, নিজেকে আবেগি কীর্তিমান নিবেদিত প্রাণ দলীয় সমর্থক হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা সফল হলো সেই সরকারি কর্মচারীর। তাহলে কি খুব একটা ভুল বললাম। ধরে নিলাম একান্ত বিবেকের টানে তিনি কাজটি করেছেন। তাহলে বিবেক বর্জিত যে সমস্ত অসংখ্য কাণ্ড দেশে ঘটেছে সে সময় কেন আমি নির্বাক, নিরুত্তাপ ছিলাম। 

উত্তরটা হচ্ছে আমি সরকারি কর্মচারী, আমি এসব নিয়ে কোন বক্তব্য দিলে তা হবে চাকরি বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও শাস্তি যোগ্য অপরাধ। আমি উন্মাদ বা শিশু নই তাহলে সব জেনেও কেন আমি এসব আচরণ করছি। সেখান থেকেই শুরু। রাজনীতি এখন আলাদিনের চেরাগ। আমি যদি কোনোভাবে একটা রাজনৈতিক পদ বাগিয়ে নিতে পারি তবে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আর ভাবতে হবে না। শুধু রাজনৈতিক পদই না কোনো রাজনৈতিক নেতার পিয়ন দারোয়ান ড্রাইভার হতে পারলেও ভাগ্য খুলে যাবে। এখন যে কোনো পদের চাকরির জন্য কোনো বিশেষ জায়গায় পদায়নের জন্য, পদোন্নতির জন্য হাদিয়া প্রথার ব্যাপক প্রচলন হয়েছে। 

আগেও ছিল, তবে গত পনেরো বছরে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। হাদিয়ার পরিমাণ নির্ভর করে পদের ওপর আর পদের উপরি আয়ের সীমার ওপর। কিছুদিন আগের খবরের কাগজে দেখেছিলাম, একজন সচিবের বাসা থেকে নগদ কয়েক কোটি টাকা পাওয়া গেছে। এ সমস্ত টাকা-পয়সা, পদ-পদবি, গাড়ি-বাড়ি–সব কিছুর পিছনে আছে রাজনীতির ছত্রছায়া। ওসি-ডিসি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ পর্যন্ত এই হাদিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। শুনেছি এসব পদের হাদিয়ার পরিমাণ নাকি অর্ধ কোটি, এমনকি কোটিও ছাড়িয়ে যায়। যদি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হাদিয়ার মাধ্যমে ভিসির মতো পদ অধিকার করেন তবে তার নৈতিক অবস্থানটা কোথায় তা একবার চিন্তা করুন। 

আর চিন্তা করারও দরকার নেই। তাদের আচরণই এটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। একজন ছাত্রের কাছে তার পরিচয় দাঁড়ায় ভিসি স্যার হিসেবে নয়, অমুক রাজনৈতিক দলের একনিষ্ঠ কর্মী সমর্থক হিসাবে। বিগত সরকার যাওয়ার সাথে সাথেই পদত্যাগ করে সময় মতো সটকে পড়েছে। সভ্য কোনো দেশে শুনেছেন, সরকার পরিবর্তন হলে ভিসি পরিবর্তন হয়। সরকার পরিবর্তনের সাথে ভিসি পরিবর্তনের সম্পর্ক কী? সম্পর্ক রাজনীতি। 

যাহোক সবাইকে রাজনীতি করতে হবে, যদি আপনি কিছু একটা হতে চান। একটা কথা প্রচলিত আছে, আগে জমিদাররা রাজনীতি করে নিঃস্ব হতেন, আর এখন ফকিররা রাজনীতি করে জমিদার হয়ে যায়। এবারে পুরোনো কথায় ফিরে আসি, সেই ম্যাজিস্ট্রেটের ঘটনায় অনেক সুশীল এটাকে গণতন্ত্র আর বাকস্বাধীনতার চর্চা বলার চেষ্টা করছেন। কথাটা ঠিক, যদি এই বক্তব্যটা আমি বা আপনি দিতেন অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দেওয়া হতো–তাহলে কোনো কথাই ছিল না। খুবই স্বাভাবিক সরকারের সমালোচনা তো হবেই। একবার ভাবুন তো গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে পরিচিত ইংল্যাণ্ড বা আমেরিকার কোনো সরকারি কর্মচারীকে সরকারের কোনো সমালোচনা করতে বা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কথা বলতে শুনেছেন কিনা। কারণ যে দেশেই হোক না কেন এটা নিয়ম বহির্ভূত কর্মকাণ্ড। তাহলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে বাধ্য। এখানে তাই হয়েছে। 

আগে ব্যবসায়ীরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকত। কেননা এটা তাদের জায়গা না। কিন্তু এখন তারা রাজনৈতিক নেতাদের মতো মঞ্চে উঠে হাত-পা ছুঁড়ে তাদের দলের পক্ষে বক্তব্য দিচ্ছেন। কেন? তাদের দরকার কি, এভাবে কথা বলার। ওই যে বললাম রাজনীতি। ওর মাধ্যমে হাতিয়ে নিতে হবে অবৈধ সুবিধা। গড়ে তুলতে পারব সম্পদের পাহাড়। চাপা পড়ে যাবে আমার সমস্ত অপকর্ম। যদি অবশ্য আমি রাজনীতির ঢাল আর তলোয়ার জায়গা মতো চালাতে পারি। এখন তাই ব্যবসায়ীই রাজনীতিবিদ আর সব রাজনীতিবিদই ব্যবসায়ী। সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। 

আর তাই যোগ্য আর সৎ রাজনীতিবিদ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এখন নিশ্চয় আমাদের কাছে বাংলা শিক্ষকের সেই ভাবসম্প্রসারণের মর্মার্থ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, বন্যেরা বনে সুন্দর। আমাদের সংস্কারের মূল লক্ষ্য হবে, যে কাজের জন্য যোগ্য সে তার সীমার মধ্যে থেকে সততা নিষ্ঠা নিয়মানুবর্তিতা আর দক্ষতার মধ্যে নিরলস ভাবে কাজ করে যাবে। তবেই দেশ এগিয়ে যাবে। 

লেখক: গবেষক

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]